রাস লাফানে ড্রোন অ্যাটাক হয়েছে, আর সেই কম্পন এসে লাগছে ঢাকার রান্নাঘরে। বিষয়টা অতটা সরল মনে না হলেও বাস্তবতা মোটামুটি এটাই। কাতার এনার্জি এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, ফোর্স মাজ্যুর ঘোষণা হয়েছে, আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে ৮৬ শতাংশ। প্রায় সাতশো জাহাজ আটকে আছে দুই পাশে। পৃথিবীর যে প্রণালি দিয়ে ৪০ শতাংশ জ্বালানি যাতায়াত করে, সেটা যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশের কী হবে সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
দেশে এখন গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির মধ্যে যে ৯৫ কোটি ঘনফুট আসছে এলএনজি থেকে, সেটার একটা বড় অংশ আসে কাতার থেকেই। পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় এ বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির কথা, যার মধ্যে কাতার থেকেই ৪০টি। গ্রীষ্মকাল আসছে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে, আর ঠিক এই মুহূর্তে সেই সরবরাহের পথটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা থাকে একটা সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার। কিন্তু যে সরকার ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে একটা নির্বাচনী প্রহসনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসেছে, তাদের কাছ থেকে সেই প্রত্যাশা করাটাই হয়তো বাড়াবাড়ি। জনগণ যে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই নির্বাচনে জেতা মানুষগুলোর কাছে জনগণের জ্বালানি সংকট কতটা অগ্রাধিকার পাবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ রাখার যথেষ্ট কারণ আছে।
আর বিএনপির কথা বলতে গেলে ইতিহাসটা একটু মনে করা দরকার। জিয়াউর রহমান সেনাছাউনিতে বসে যে দলটা বানিয়েছিলেন, সেই দলটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যতবার এসেছে, ততবারই একটা বিশেষ ধরনের ক্ষতি রেখে গেছে। জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, ইসলামিক জঙ্গিবাদের উত্থানের মতো ঘটনা ও তাদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে লুটপাটের যে উত্তরাধিকার বিএনপি রেখে গেছে, সেটা এখনো এই খাতকে দুর্বল করে রেখেছে। এই মুহূর্তে বৈশ্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো গত ১৮ মাসে যে ভঙ্গুর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার দায় শুধু আজকের সরকারের না, সুদখোর ইউনুসের অ-সরকারের শাসনামলে যে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা হয়েছে সেটারও।
এখন দরকার ছিল সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট কথা বলা। কতটুকু মজুত আছে, বিকল্প সরবরাহকারী কারা হতে পারে, স্পট মার্কেটে কেনার সক্ষমতা আছে কিনা, শিল্প আর গৃহস্থালির মধ্যে অগ্রাধিকার কীভাবে ঠিক করা হবে। এসব নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই বললেই চলে। সচিবালয়ে গাড়ির বহর কমেনি, সরকারি বাসভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো নির্দেশনা নেই, অথচ সাধারণ মানুষকে লোডশেডিং সামলাতে হবে।
একটা সংকট যখন বাইরে থেকে আসে, তখন সরকারের দোষ সবটা না। কিন্তু সেই সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতি না থাকলে সেটার দায় পুরোটাই সরকারের। বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বাইরের ঘটনার ধাক্কা এসে পড়েছে একটা অপ্রস্তুত, অবৈধ, এবং জনবিচ্ছিন্ন সরকারের ঘাড়ে।

