হত্যা কখনো মীমাংসিত হয় না: যাদের কথা রাষ্ট্র ভুলে যেতে বলছে

রাত তিনটায় দরজায় টোকা পড়েছিল। রহিমা বেগম দরজা খুলেছিলেন। তারপর থেকে আর কখনো ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। স্বামীর লাশ বাড়ি এসেছিল পরের দিন ভোরে। তার স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন। অপরাধ বলতে এটুকুই।

রহিমা বেগম এখন বিচার চান। কিন্তু বিচার চাইতে গেলে কোথায় যাবেন? আদালতে গেলে শুনবেন, এই মামলা চলবে না। অধ্যাদেশ আছে। সরকার যদি বলে এটা “অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ”, তাহলে আদালতও চুপ করে থাকবে। রহিমা বেগমের কান্নার কোনো আইনি মূল্য নেই এই রাষ্ট্রে, অন্তত এই মুহূর্তে।

এটাকেই বলে দায়মুক্তি।

শব্দটা শুনতে ওজনদার লাগে, কিন্তু অর্থটা খুব সরল। কেউ কাউকে মেরে ফেলল, আর রাষ্ট্র বলল, ঠিক আছে, হয়ে গেছে, এগিয়ে যাও। ব্যস। হত্যাকারী গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর নিহতের পরিবার দরজায় দরজায় ঘুরছে।

নাহিদ ইসলাম বলেছেন এটা “মীমাংসিত বিষয়”। মীমাংসিত। একটু ভাবুন, কার সাথে মীমাংসা হলো? রহিমা বেগমকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল? তিনি কি বলেছিলেন, ঠিক আছে, মাফ করে দিলাম, আর মামলা করব না? না। তিনি জানতেনই না যে তার হয়ে কেউ “মীমাংসা” করে ফেলছে।

এই মীমাংসাটা হয়েছে রাজনৈতিক টেবিলে, ভুক্তভোগীকে বাইরে রেখে। এটাই সমস্যার মূল।

জামায়াতে ইসলামী এই দায়মুক্তির পক্ষে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। একাত্তরে যে সংগঠনের নেতারা পাকিস্তানি বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছিল, সেই সংগঠন এখন বলছে অপরাধের বিচার হওয়া উচিত না। এর মধ্যে একটা ভয়াবহ সামঞ্জস্য আছে। যারা নিজেরা কখনো বিচারের মুখোমুখি হতে চায়নি, তারা অন্যদের বিচার থেকেও বাঁচাতে চায়। নিজেদের টিকিয়ে রাখার এই কৌশলটা জামায়াত বহু বছর ধরে রপ্ত করেছে।

বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ফেব্রুয়ারিতে বসেছে। আর এখন পুনঃতদন্তের কথা বলছে। কিন্তু এই দলটার নিজের হাতও পরিষ্কার না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে এই দেশের সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর উপর যা হয়েছিল, সেই মায়েদের কান্নার বিচার কি বিএনপি চেয়েছিল কখনো? চায়নি। তখন সেটাও “মীমাংসিত বিষয়” ছিল।

তাহলে এখন কেন পুনঃতদন্ত? কারণ এখন সেটা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রহিমা বেগমের কান্না এই রাজনীতিতে একটা দাবার ঘুঁটি।

এটা ভুক্তভোগীদের প্রতি সুবিচার না, এটা তাদের লাঞ্চনা।

সত্যিকারের বিচার মানে হলো, একই সময়ে যা যা হয়েছে সব কিছুর তদন্ত হবে। পুলিশ হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক কর্মী হত্যা, সব। কোনো পক্ষকে ছাড় নেই। কিন্তু সেটা হবে না, কারণ সেটা হলে অনেকেরই অস্বস্তি হবে। তাই একটু তদন্ত হবে, বাকিটা থাকবে “মীমাংসিত”।

১৯৭৫ সালেও এভাবেই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ইনডেমনিটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঢাকনা সরাতে দুই দশক লেগেছিল। সেই দুই দশকে এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটাই বার্তা গেঁথে গিয়েছিল, ক্ষমতায় থাকলে খুন করলেও পার পাওয়া যায়।

সেই বার্তাটা আবার দেওয়া হচ্ছে। ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন সময়, কিন্তু বার্তাটা একই।

রহিমা বেগম জানেন না ট্রানজিশনাল জাস্টিস কী। তিনি জানেন না গেম থিওরি কী। তিনি শুধু জানেন তার স্বামী ফেরেনি, আর যারা তাকে নিয়ে গেছে তারা ফুরফুরে আছে। এটুকু বোঝার জন্য রাজনীতিবিদ হতে হয় না। প্রশ্ন হলো, এই দেশের বাকি মানুষ কতটুকু বোঝে।

রাত তিনটায় দরজায় টোকা পড়েছিল। রহিমা বেগম দরজা খুলেছিলেন। তারপর থেকে আর কখনো ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। স্বামীর লাশ বাড়ি এসেছিল পরের দিন ভোরে। তার স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন। অপরাধ বলতে এটুকুই।

রহিমা বেগম এখন বিচার চান। কিন্তু বিচার চাইতে গেলে কোথায় যাবেন? আদালতে গেলে শুনবেন, এই মামলা চলবে না। অধ্যাদেশ আছে। সরকার যদি বলে এটা “অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ”, তাহলে আদালতও চুপ করে থাকবে। রহিমা বেগমের কান্নার কোনো আইনি মূল্য নেই এই রাষ্ট্রে, অন্তত এই মুহূর্তে।

এটাকেই বলে দায়মুক্তি।

শব্দটা শুনতে ওজনদার লাগে, কিন্তু অর্থটা খুব সরল। কেউ কাউকে মেরে ফেলল, আর রাষ্ট্র বলল, ঠিক আছে, হয়ে গেছে, এগিয়ে যাও। ব্যস। হত্যাকারী গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর নিহতের পরিবার দরজায় দরজায় ঘুরছে।

নাহিদ ইসলাম বলেছেন এটা “মীমাংসিত বিষয়”। মীমাংসিত। একটু ভাবুন, কার সাথে মীমাংসা হলো? রহিমা বেগমকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল? তিনি কি বলেছিলেন, ঠিক আছে, মাফ করে দিলাম, আর মামলা করব না? না। তিনি জানতেনই না যে তার হয়ে কেউ “মীমাংসা” করে ফেলছে।

এই মীমাংসাটা হয়েছে রাজনৈতিক টেবিলে, ভুক্তভোগীকে বাইরে রেখে। এটাই সমস্যার মূল।

জামায়াতে ইসলামী এই দায়মুক্তির পক্ষে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। একাত্তরে যে সংগঠনের নেতারা পাকিস্তানি বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছিল, সেই সংগঠন এখন বলছে অপরাধের বিচার হওয়া উচিত না। এর মধ্যে একটা ভয়াবহ সামঞ্জস্য আছে। যারা নিজেরা কখনো বিচারের মুখোমুখি হতে চায়নি, তারা অন্যদের বিচার থেকেও বাঁচাতে চায়। নিজেদের টিকিয়ে রাখার এই কৌশলটা জামায়াত বহু বছর ধরে রপ্ত করেছে।

বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ফেব্রুয়ারিতে বসেছে। আর এখন পুনঃতদন্তের কথা বলছে। কিন্তু এই দলটার নিজের হাতও পরিষ্কার না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে এই দেশের সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর উপর যা হয়েছিল, সেই মায়েদের কান্নার বিচার কি বিএনপি চেয়েছিল কখনো? চায়নি। তখন সেটাও “মীমাংসিত বিষয়” ছিল।

তাহলে এখন কেন পুনঃতদন্ত? কারণ এখন সেটা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রহিমা বেগমের কান্না এই রাজনীতিতে একটা দাবার ঘুঁটি।

এটা ভুক্তভোগীদের প্রতি সুবিচার না, এটা তাদের লাঞ্চনা।

সত্যিকারের বিচার মানে হলো, একই সময়ে যা যা হয়েছে সব কিছুর তদন্ত হবে। পুলিশ হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক কর্মী হত্যা, সব। কোনো পক্ষকে ছাড় নেই। কিন্তু সেটা হবে না, কারণ সেটা হলে অনেকেরই অস্বস্তি হবে। তাই একটু তদন্ত হবে, বাকিটা থাকবে “মীমাংসিত”।

১৯৭৫ সালেও এভাবেই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ইনডেমনিটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঢাকনা সরাতে দুই দশক লেগেছিল। সেই দুই দশকে এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটাই বার্তা গেঁথে গিয়েছিল, ক্ষমতায় থাকলে খুন করলেও পার পাওয়া যায়।

সেই বার্তাটা আবার দেওয়া হচ্ছে। ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন সময়, কিন্তু বার্তাটা একই।

রহিমা বেগম জানেন না ট্রানজিশনাল জাস্টিস কী। তিনি জানেন না গেম থিওরি কী। তিনি শুধু জানেন তার স্বামী ফেরেনি, আর যারা তাকে নিয়ে গেছে তারা ফুরফুরে আছে। এটুকু বোঝার জন্য রাজনীতিবিদ হতে হয় না। প্রশ্ন হলো, এই দেশের বাকি মানুষ কতটুকু বোঝে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ