বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখি, ফেব্রুয়ারির নরম রোদে বইমেলা জমে উঠবে উঠবে করেও যেনো উঠছে না। কোথাও যেন একটা সুর কেটে যাওয়া শূন্যতা টের পাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের কাঠগোলাপ গন্ধ মাখা নতুন বইয়ের সংখ্যা যে হাতে গোনা। এই উপলব্ধি মনের কোণে কেমন জানি বিষাদের ছায়া ফেলে দেয়।
অভিশপ্ত ‘২৪ এর সেই ভয়াল জুলাইয়ের স্মৃতি এখনও ভোলে নি কেউ। দেশব্যাপী যখন দাঙ্গা বাঁধিয়ে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ফেলা হলো, তখন দেশবাসী বুঝতেও পারেনি এত বড় বিপর্যয় নেমে আসবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। সেদিন যারা ক্যু করলো, তারা তো শুধু সরকার বদলায়নি, বদলে দিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ধারা।
এবার মেলায় ঘুরে দেখলাম, সালেক খোকনের ‘মুক্তিযুদ্ধে অবিনাশী ঘটনামালা’ বেরিয়েছে কথাপ্রকাশ থেকে। তানিয়া ঊর্মির ‘সেতারে স্বাধীনতার সুর’ এনেছে বাতিঘর। মুনতাসীর মামুনের ‘১৯৭১: অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস’ এসেছে অনন্যা থেকে। কিন্তু এই কটি বই যেন মরুভূমিতে কয়েক ফোঁটা শিশির। আগুনে পুড়ে যাওয়া এক বাগানে হঠাৎ ফোটা দু-চারটি ফুল।
গবেষক সালেক খোকনের ভাষ্য শুনলে বুক মুচরে ওঠে। বিগত দেড় বছরে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে অনেকে এবার বই প্রকাশে সাহস করেননি। সাহস করেননি! এই ভয়টা কোথা থেকে এলো? ভয়টা এলো ক্ষমতার মসনদে বসা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের হাত থেকে।
এখন তো রাজাকারদের উৎসব চলছে। জামাতীরা খোলাখুলিভাবে নতুন ইতিহাস রচনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের অনলাইন বই শপ রকমারিতে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গায়েব করে দেয়ার পর আর বুঝতে বাকি থাকে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এখন কোথায় যাবে।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতায় নেই। মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও বাহক যারা, তারা এখন গুটিকয়েক সাহসী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যারা এখন ক্ষমতায়, তারা ১৯৭১ সালের সেই গণহত্যার নায়কই শুধু নয়, সেই সাথে রাজাকার-আলবদর বাহিনীর উত্তরসূরিও। স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসে জন্ম নেয়া দলটি এখন দুর্নীতি-সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর থেকে বেরিয়ে পুরো জাতিকে গ্রাস করতে বসেছে তাদের কাঁধে চড়ে বসা জামাত-শিবিরের প্ররোচনায়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্টলে দেখা গেল, কিছু ভিউকার্ড আর পতাকা বিক্রি হচ্ছে। হারেছ-উজ-জামান বললেন, লোকজন আসছে, জানতে চাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কী আছে। তারা চায় যুদ্ধকালীন সেই গৌরবের স্মৃতি। কিন্তু সেই স্মৃতি তো আর শুধু ভিউকার্ডের ছবিতে বাঁচে না। তা বাঁচে নতুন প্রজন্মের হাতে উঠে আসা বইয়ের পাতায়। কিন্তু সেই পাতাগুলো আজ মলাটবন্দি হওয়ার আগেই আতঙ্কে কুঁকড়ে আছে।
প্রকাশক জাফর আহমদ রাশেদের কথা শুনলাম। তিনি বললেন, কী বই প্রকাশ করা যাবে, কী যাবে না তা নিয়েও সংশয় ছিল। এই সংশয় কেবল অর্থনীতির নয়, এই সংশয় রাজনীতির, এই সংশয় দেশপ্রেমের মাপকাঠি নিয়েও।
গবেষক মামুন সিদ্দিকী জানালেন, অনেকের পাণ্ডুলিপি তৈরি, কিন্তু তারা প্রকাশে ভয় পাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীরা যখন শক্ত অবস্থানে, তখন সত্য কথা বলা রীতিমতো সাহসের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার মনে হয়, এই অবস্থা স্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ফিরলে, সরকার যাই হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু এই আশায় বসে থাকলে চলবে না। আমাদেরই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের মূল, এই সত্য অস্বীকার করার অধিকার কারো নেই।
বইমেলা এখনো চলছে। হয়তো আরো কিছু বই আসবে। কিন্তু যে বইগুলো আসবে, সেগুলো যদি স্বাধীনতা বিরোধীদের লেখা হয়, যদি জামাতের নতুন ইতিহাস রচনার চেষ্টা হয়, তবে সেগুলো কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের বই? নাকি সেগুলো হবে আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করার আরেক অপচেষ্টা?
আমি ঘুরে ফিরি মেলা প্রাঙ্গণে। বুকে বাজে মুক্তিযুদ্ধের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতি। মনে পড়ে লাখো শহীদের রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা। সেই রক্তের দাম আজ এত সস্তা হয়ে যাবে, কল্পনাও করিনি। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নই আমরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের রক্তে মিশে আছে, তাকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। এই বাঙালি আবার জেগে উঠবে, আবার লিখবে তার ইতিহাস। আবার ফিরে আসবে সেই কাঠগোলাপের গন্ধ, আবার ভরে যাবে বইমেলা মুক্তিযুদ্ধের অগণিত বইয়ে। পলাশ-শিমুলে মুখরিত হবে আবারও অমর একুশে বইমেলা।

