জিরো টলারেন্সের সরকার, জিরো জবাবদিহির দেড় বছর

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর উত্তাল দিনগুলোর পর যখন মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসলেন, তখন তার মুখে ছিল একটাই প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সংস্কার হবে, স্বচ্ছতা আসবে, পুরোনো দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থার গলা টিপে ধরা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে লক্ষ মানুষ আশা বুকে বেঁধেছিল। দেড় বছর পর সেই আশার জায়গায় যা দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো বুকে লাগে।

যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলে ক্ষমতায় এলো, সেই সরকারের ভেতর থেকেই একের পর এক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ বেরিয়ে আসছে। এটা শুধু বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রচার নয়, দুদক তদন্ত করছে, টিআইবি রিপোর্ট দিচ্ছে, ঢাকা চেম্বার অফ কমার্সের মতো ব্যবসায়ী সংগঠন সরাসরি বলছে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি চলছে, কারখানায় ঢুকতে টাকা দিতে হচ্ছে। সরকারি দপ্তরে একটা দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি, এ কথা যখন ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলছেন, তখন সরকারের “সাফল্যের” ন্যারেটিভটা কোথায় দাঁড়ায়?

স্বজনপ্রীতির যে ছবিটা উঠে এসেছে, সেটা নিয়ে কথা না বললেই নয়। স্বাস্থ্য খাতে কোনো পেশাদার অভিজ্ঞতা ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক অ্যাক্টিং এমডি নূরজাহান বেগম হলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। ইউনূসের নিজের ভাগ্নে পেলেন ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারির পদ। ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদ হলেন এসডিজি মুখ্য সমন্বয়ক, এসডিজি বাস্তবায়নে তার কী অভিজ্ঞতা সেটা কেউ জানাতে পারেননি। শপথের পরপরই নিজের ঘনিষ্ঠদের রাষ্ট্রীয় পদে বসানোর এই তাড়াহুড়ো দেখে মনে হয় না এটা কোনো দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ, এটা পুরোনো আমলের মতো একটা “আমাদের লোক” সংস্কৃতি।

আরও বড় প্রশ্ন হলো গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে একের পর এক রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকমের জন্য ২০২৯ পর্যন্ত কর অব্যাহতি, সরকারি শেয়ার ২৫ থেকে ১০ শতাংশে নামানো, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, রপ্তানি লাইসেন্স, ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমতি। ২০০৯ সালে বাতিল হওয়া গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের আবেদন হঠাৎ করে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে অনুমোদন পেল। একজন মানুষ একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এবং বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক হলে স্বার্থের সংঘাত যে অনিবার্য, এই সরল কথাটা স্বীকার করার সৎ সাহসটুকুও এই সরকারের নেই।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিয়ে যা বেরিয়েছে, সেটা তো রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। মিনি-স্টেডিয়াম প্রকল্পের খরচ ১৫৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১২০০ কোটি টাকা বেশি করা, তার এপিএস মোয়াজ্জেমের ট্রান্সফার-পোস্টিংয়ে কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগে দুদক তদন্ত, বরখাস্ত। আর কিছু রিপোর্টে দুবাইসহ চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা যদি ১০ ভাগও সত্য হয়, তাহলে এই মানুষটা কোন মুখে “বিপ্লবের সন্তান” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন?

ফয়েজ আহমদ তৈয়ব গেছেন দেশ ছেড়ে, দুদকও বিস্মিত। ৫৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে আর তিনি বিদেশে। গ্রামীণফোনকে নীতিমালার বাইরে সুবিধা দেওয়া, বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার প্রকল্পের খরচ ১৬৫ কোটি থেকে ৩২৬ কোটিতে নিয়ে যাওয়া, নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নিজের লোক বসানো। তৈয়ব আর ইউনূসের সম্পর্ক নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো জনগণের প্রশ্ন, এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সম্পদ বিবরণীর ঘটনাটা একটা বিশেষ নাটকীয়তার। আগস্টে ঘোষণা, অক্টোবরে নীতিমালা, আর প্রকাশ হলো ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ, নির্বাচনের ঠিক আগে। দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে দেড় কোটির বেশি। ১৮ জনের সম্পদ বেড়েছে। উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অভিনেত্রী স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে দেড় কোটির বেশি। আলী রিয়াজ আর লুৎফে সিদ্দিকীর সম্পদের হিসাব প্রকাশই হয়নি। এই স্বচ্ছতার নাম কী দেওয়া যায় সেটা পাঠকের বিচার্য।

একজন সাবেক সচিব সরাসরি বললেন অন্তত আট জন উপদেষ্টার দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে আছে। সরকার বলল ভিত্তিহীন। টিআইবি বলছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আছে। দুদকের অনেক তদন্ত ডিপ ফ্রিজে। তাহলে জিরো টলারেন্সটা ঠিক কোথায় কার্যকর হলো?

যে মানুষটা বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য দূরীকরণের বক্তৃতা দিয়ে নোবেল জিতেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একের পর এক ছাড় নিচ্ছেন। এটা নৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য সেই প্রশ্নটা বাংলাদেশের মানুষের তোলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। নোবেল পুরস্কার জবাবদিহিতার উর্ধ্বে উঠিয়ে দেয় না।

ইতিহাস কঠিন। যারা পুরোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতায় আসে, তারা যখন নতুন দুর্নীতিতে ডুবে যায়, তখন মানুষের হতাশা হয় সবচেয়ে গভীর। কারণ সেই হতাশার সঙ্গে মিশে থাকে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর উত্তাল দিনগুলোর পর যখন মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসলেন, তখন তার মুখে ছিল একটাই প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সংস্কার হবে, স্বচ্ছতা আসবে, পুরোনো দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থার গলা টিপে ধরা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে লক্ষ মানুষ আশা বুকে বেঁধেছিল। দেড় বছর পর সেই আশার জায়গায় যা দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো বুকে লাগে।

যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলে ক্ষমতায় এলো, সেই সরকারের ভেতর থেকেই একের পর এক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ বেরিয়ে আসছে। এটা শুধু বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রচার নয়, দুদক তদন্ত করছে, টিআইবি রিপোর্ট দিচ্ছে, ঢাকা চেম্বার অফ কমার্সের মতো ব্যবসায়ী সংগঠন সরাসরি বলছে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি চলছে, কারখানায় ঢুকতে টাকা দিতে হচ্ছে। সরকারি দপ্তরে একটা দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি, এ কথা যখন ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলছেন, তখন সরকারের “সাফল্যের” ন্যারেটিভটা কোথায় দাঁড়ায়?

স্বজনপ্রীতির যে ছবিটা উঠে এসেছে, সেটা নিয়ে কথা না বললেই নয়। স্বাস্থ্য খাতে কোনো পেশাদার অভিজ্ঞতা ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক অ্যাক্টিং এমডি নূরজাহান বেগম হলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। ইউনূসের নিজের ভাগ্নে পেলেন ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারির পদ। ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদ হলেন এসডিজি মুখ্য সমন্বয়ক, এসডিজি বাস্তবায়নে তার কী অভিজ্ঞতা সেটা কেউ জানাতে পারেননি। শপথের পরপরই নিজের ঘনিষ্ঠদের রাষ্ট্রীয় পদে বসানোর এই তাড়াহুড়ো দেখে মনে হয় না এটা কোনো দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ, এটা পুরোনো আমলের মতো একটা “আমাদের লোক” সংস্কৃতি।

আরও বড় প্রশ্ন হলো গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে একের পর এক রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকমের জন্য ২০২৯ পর্যন্ত কর অব্যাহতি, সরকারি শেয়ার ২৫ থেকে ১০ শতাংশে নামানো, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, রপ্তানি লাইসেন্স, ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমতি। ২০০৯ সালে বাতিল হওয়া গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের আবেদন হঠাৎ করে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে অনুমোদন পেল। একজন মানুষ একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এবং বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক হলে স্বার্থের সংঘাত যে অনিবার্য, এই সরল কথাটা স্বীকার করার সৎ সাহসটুকুও এই সরকারের নেই।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিয়ে যা বেরিয়েছে, সেটা তো রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। মিনি-স্টেডিয়াম প্রকল্পের খরচ ১৫৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১২০০ কোটি টাকা বেশি করা, তার এপিএস মোয়াজ্জেমের ট্রান্সফার-পোস্টিংয়ে কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগে দুদক তদন্ত, বরখাস্ত। আর কিছু রিপোর্টে দুবাইসহ চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা যদি ১০ ভাগও সত্য হয়, তাহলে এই মানুষটা কোন মুখে “বিপ্লবের সন্তান” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন?

ফয়েজ আহমদ তৈয়ব গেছেন দেশ ছেড়ে, দুদকও বিস্মিত। ৫৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে আর তিনি বিদেশে। গ্রামীণফোনকে নীতিমালার বাইরে সুবিধা দেওয়া, বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার প্রকল্পের খরচ ১৬৫ কোটি থেকে ৩২৬ কোটিতে নিয়ে যাওয়া, নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নিজের লোক বসানো। তৈয়ব আর ইউনূসের সম্পর্ক নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো জনগণের প্রশ্ন, এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সম্পদ বিবরণীর ঘটনাটা একটা বিশেষ নাটকীয়তার। আগস্টে ঘোষণা, অক্টোবরে নীতিমালা, আর প্রকাশ হলো ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ, নির্বাচনের ঠিক আগে। দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে দেড় কোটির বেশি। ১৮ জনের সম্পদ বেড়েছে। উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অভিনেত্রী স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে দেড় কোটির বেশি। আলী রিয়াজ আর লুৎফে সিদ্দিকীর সম্পদের হিসাব প্রকাশই হয়নি। এই স্বচ্ছতার নাম কী দেওয়া যায় সেটা পাঠকের বিচার্য।

একজন সাবেক সচিব সরাসরি বললেন অন্তত আট জন উপদেষ্টার দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে আছে। সরকার বলল ভিত্তিহীন। টিআইবি বলছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আছে। দুদকের অনেক তদন্ত ডিপ ফ্রিজে। তাহলে জিরো টলারেন্সটা ঠিক কোথায় কার্যকর হলো?

যে মানুষটা বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য দূরীকরণের বক্তৃতা দিয়ে নোবেল জিতেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একের পর এক ছাড় নিচ্ছেন। এটা নৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য সেই প্রশ্নটা বাংলাদেশের মানুষের তোলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। নোবেল পুরস্কার জবাবদিহিতার উর্ধ্বে উঠিয়ে দেয় না।

ইতিহাস কঠিন। যারা পুরোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতায় আসে, তারা যখন নতুন দুর্নীতিতে ডুবে যায়, তখন মানুষের হতাশা হয় সবচেয়ে গভীর। কারণ সেই হতাশার সঙ্গে মিশে থাকে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ