কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মুলকুচ বিবির বয়স সত্তর। স্বামী নেই সাতাশ বছর ধরে। মেয়ে আর জামাই দুজনেই গার্মেন্টস শ্রমিক। সেহরি খেয়ে ভোরে বেরিয়ে পড়েন, লাইনে দাঁড়ান, মেট্রোর সিঁড়িতে বসে জিরিয়ে নেন, দুপুরে হাতে পান পাঁচশো পঞ্চাশ টাকার একটি প্যাকেট। এটুকুই তার দিনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
এই ছবিটা দেখলে অনেক কিছু বোঝা যায়। কিন্তু যে প্রশ্নটা কেউ জোরে করছে না সেটা হলো, আমরা এখানে এলাম কীভাবে?
২০০৮ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল পঁয়ত্রিশ শতাংশের কাছাকাছি। পরের দেড় দশকে সেটা নামতে নামতে আঠারো দশমিক সাত শতাংশে এসেছিল। সংখ্যাটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের গল্প। সেই গল্প হয়তো নিখুঁত ছিল না, সমালোচনার জায়গা ছিল, কিন্তু দিকটা সামনের দিকেই ছিল।
তারপর ২০২৪ সালের পরিবর্তন এলো। নতুন নেতৃত্ব এলো, নতুন প্রতিশ্রুতি এলো। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে দারিদ্র্যের হার বেড়ে বাইশ দশমিক নয় শতাংশ হতে পারে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার বলছে সেটা আরও বেশি, প্রায় আটাশ শতাংশ। চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের হার পাঁচ দশমিক ছয় থেকে লাফ দিয়ে নয় দশমিক পঁয়ত্রিশে উঠেছে।
মাত্র কয়েক মাসে এই পতন কীভাবে হলো?
অর্থনীতির নিজস্ব গতি আছে, সত্যি। কিন্তু নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেরও প্রভাব আছে। ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে সময়টুকু ক্ষমতায় ছিল, সেই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে আট দশমিক উনত্রিশ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজারে সয়াবিন, ডাল, চিনির দাম এমন জায়গায় গেছে যে একজন রিকশাচালকের স্ত্রীর কাছে চারশো টাকার সাশ্রয় মানে সংসার চলা আর না চলার পার্থক্য।
এই অবস্থায় সরকার টিসিবির ট্রাক নামিয়েছে, এটা ভালো কথা। কিন্তু ঢাকায় পঞ্চাশটা পয়েন্টে চারশো পরিবারের হিসাবে যে পরিমাণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে, সেটা চাহিদার তুলনায় কতটুকু? মো. শাকিলকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাবের দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। মিনুয়ারা বেগমকে এক বছরের শিশু কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়াতে হচ্ছে। নাসির খান ভাঙা পা নিয়ে রিকশায় বসে স্ত্রীর ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন।
এটা কি সত্যিকারের সমাধান, নাকি সমস্যা আড়াল করার একটা আয়োজন?
এখন ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে সতেরো তারিখ থেকে। ইউনুস সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ভঙ্গুর, সেটা টিসিবির লাইনের দৈর্ঘ্যই বলে দিচ্ছে। কিন্তু বিএনপির নিজের ইতিহাসও তো স্বচ্ছ নয়। যে দলটি দুর্নীতিতে বারবার বিতর্কিত হয়েছে, যে দলের শাসনে সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছিল তার নিজস্ব রেকর্ড আছে, তারা এখন কী করবে?
সানেমের অধ্যাপক সেলিম রায়হান ঠিকই বলেছেন, টানা মূল্যস্ফীতিতে মানুষ চরম চাপে আছে। টিসিবির কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার, নিম্নআয়ের এলাকায় বিতরণ ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
কিন্তু এই পরামর্শ কার কাছে যাচ্ছে? যে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে তিনি সাড়া দেননি। টিসিবির চেয়ারম্যানও নীরব।
নীরবতাটাই আসলে সবচেয়ে জোরে কথা বলছে।
মুলকুচ বিবি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ব্যাগ সাজিয়ে রাখেন পরদিন ভোরে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য। এই দৃশ্যটা বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির বাস্তবতা। যে বাস্তবতা কোনো সরকারই গর্বের সাথে সামনে রাখতে পারে না, কিন্তু যে বাস্তবতা তৈরি করার দায় থেকে কেউই সরে যেতে পারে না।

