পাবনার ঈশ্বরদীতে শনিবার রাতে একটা পনেরো বছরের মেয়েকে তার ঘর থেকে তুলে নিয়ে সরিষার ক্ষেতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে, বিবস্ত্র, নিথর। দাদিকে মেরে ফেলা হয়েছে কুপিয়ে, নিজের উঠানে। এই ঘটনার পরে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে কোনো শব্দ নেই। নামসর্বস্ব যে মন্ত্রিপরিষদ এখন ঢাকায় বসে আছে, তাদের কারো মুখ খোলেনি।
এটা কাকতালীয় না।
বিএনপি যে নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছে সেই নির্বাচন নিয়ে কথা বলার আগে একটু পেছনে তাকানো দরকার। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যা হয়েছে সেটাকে নির্বাচন বলা আসলে ভোটের অপমান। আওয়ামী লীগ নেই, অন্য বড় দলগুলো নেই, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। যারা ভোট পেয়েছে তারা মূলত নিজেরা নিজেরাই একটা মহড়া দিয়ে ক্ষমতার চেয়ারে বসেছে। এই বৈধতার সংকট নিয়ে দলটার কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ বৈধতার দরকার হয় যাদের জনগণের কাছে জবাব দিতে হয়। বিএনপির ইতিহাস বলে, তারা জনগণের কাছে জবাব দেওয়ার রাজনীতি কোনোদিন করেনি।
জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল বানিয়েছিলেন সেনানিবাস থেকে, বন্দুকের জোরে ক্ষমতা নিয়ে, তারপর সেই ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে দল খুলেছিলেন। সেই দলের জিনের মধ্যে গণতন্ত্র ছিল না, জবাবদিহিতা ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা। সেটা ২০২৬ সালেও বদলায়নি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল এই দেশের নারীদের জন্য কেমন ছিল সেটা যারা মনে রাখেননি তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। সেই পাঁচ বছরে নারীদের ওপর সংঘবদ্ধ সহিংসতা, গ্রামের পর গ্রামে ধর্ষণের ঘটনা, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, মন্ত্রীদের ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। তখন জামাত ছিল সরকারের অংশ, মন্ত্রিসভায়। এখন জামাত বিরোধী দলে, কিন্তু পরিবেশটা যে একই থাকছে সেটা ঈশ্বরদীর ঘটনাই বলে দিচ্ছে।
ক্ষমতার ধরন একটা সমাজে কী বার্তা দেয় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। যখন মানুষ দেখে যে নির্বাচন প্রহসন, সরকার অবৈধ, মন্ত্রীরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না, তখন একটা বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতায় অপরাধীরা সাহসী হয়। তারা বুঝে যায় যে রাষ্ট্র তাদের কিছু করবে না, কারণ রাষ্ট্র নিজেই এখন দুর্বল আর আত্মরক্ষায় ব্যস্ত।
আজ পর্যন্ত এই সরকারের কোনো মন্ত্রী নারী নিরাপত্তা নিয়ে একটাও সুনির্দিষ্ট কথা বলেননি। কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। শুধু আছে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা আর দলের ভেতরে পদ পাওয়ার দৌড়। জামিলা আক্তার নামের পনেরো বছরের মেয়েটার কথা এই মন্ত্রিপরিষদের এজেন্ডায় আসবে না, কারণ সে তাদের রাজনীতির কোনো কাজে লাগে না।
২০০১-০৬ আবার ফিরছে কি না সেটা সময় বলবে। কিন্তু লক্ষণগুলো অস্বস্তিকর রকম চেনা।

