একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। ক্ষমতায় এসে প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে একটা অনির্বাচিত সরকার যদি পুলিশের পোশাক বদলানোকে তার অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখে, তাহলে সেই সরকারের মাথায় আসলে কী চলছে? দেশে তখন আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, অর্থনীতি টলমল করছে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর আসছে একের পর এক। আর এই সরকার ব্যস্ত পুলিশের জামার রঙ নিয়ে। এটাকে নিছক অদূরদর্শিতা বলে পার পেয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ শত কোটি টাকা এমনি এমনি উড়ে যায় না।
ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কারের যে ঢোল বাজিয়েছিল, পোশাক পরিবর্তন ছিল সেই ঢোলের সবচেয়ে ফাঁকা আওয়াজ। ধারণাটা ছিল এরকম যে পুলিশ জনগণের চোখে খারাপ হয়ে গেছে, তাহলে পোশাক বদলে দাও, মানুষ ভুলে যাবে। রঙ বদলালেই নাকি পরিচয় বদলায়। এই যুক্তি যদি কেউ সত্যিই বিশ্বাস করে থাকেন, তাহলে তার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা উচিত হয়নি। আর যদি না বিশ্বাস করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটা আরও গুরুতর।
কারণ পোশাক পরিবর্তনের পেছনে যে সিন্ডিকেটের কথা এখন বেরিয়ে আসছে, সেটা নতুন কোনো তথ্য না। পুলিশ সদর দপ্তরে এই সিন্ডিকেটের কথা আগে থেকেই জানা ছিল। ২০০৪ সালেও পোশাক বদলানো হয়েছিলো, সেবারই একই চক্র কাজ পেয়েছে, একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। ইউনূস সরকারের আমলে এই চক্রটা শুধু একটা নতুন সুযোগ পেয়েছে মাত্র। আর সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছেন দুজন সাবেক উপদেষ্টা আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বসা এক পুলিশ কর্মকর্তা।
লৌহ রঙের যে পোশাক বানানো হলো, সেটা দেখে পুলিশের নিজস্ব লোকেরাই বললেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাথে মিলে যাচ্ছে। বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ডদের সাথে গুলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়ানো পুলিশকে মানুষ পুলিশ ভাবছে না। কিন্তু এই সাধারণ সমস্যাটুকু সরকারের উপদেষ্টামহল আগে থেকে বুঝতে পারেননি, নাকি বুঝেও পরোয়া করেননি? দুটোর যেকোনোটাই হোক, ফলাফল একটাই। রাষ্ট্রের টাকা জলে গেছে।
এখন বিএনপি সরকার এসে আগের পোশাকে ফিরে যাচ্ছে। মানে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে যে পুরো কাজটা অর্থহীন ছিল। কিন্তু স্বীকার করলেই তো হবে না। শত কোটি টাকা কোথায় গেল সেটার হিসাব দিতে হবে। কারা এই পোশাক বানানোর ঠিকাদারি পেয়েছিল, কত টাকার চুক্তি হয়েছিল, মালের মান কী ছিল, এই প্রশ্নগুলোর জবাব না পেলে রাষ্ট্রের প্রতি যে অবিচার হয়েছে সেটা চাপা পড়ে যাবে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, মুহাম্মদ ইউনূস যে সরকারের প্রধান ছিলেন, এই ক্ষতির নৈতিক দায় তার এড়ানোর কোনো পথ নেই। উপদেষ্টা পরিষদের অধীনে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার সরকারের আমলে শত কোটি টাকা এভাবে খরচ হয়েছে। দায় এড়াতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু না জানাটাও কোনো সাফাই না, কারণ দেশ চালানোর দায়িত্ব নিলে কী হচ্ছে সেটা জানতে হয়।
যারা মাঝখানে মুনাফা তুলে গেছেন, তাদের চিহ্নিত করে এই মুহূর্তে একটাই কাজ করা উচিত। তাদের বানানো সেই লৌহ রঙের পোশাক তাদের গায়ে পরিয়ে দেওয়া। যতদিন তদন্ত চলবে, ততদিন। কারণ রাষ্ট্রের অর্থ নষ্ট করার একটা স্মৃতিচিহ্ন তাদের বহন করা উচিত।

