ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে তথাকথিত গণভোট হলো, সেটা নিয়ে শুরু থেকেই মানুষের মনে একটা খটকা ছিলো। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের নামে এই ভোটটা আসলে কী ছিলো? সহজ কথায় বললে, ২০২৪ সালে যে অভ্যুত্থানের নামে দেশের নির্বাচিত সরকারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, সেই ঘটনাটাকে একটা সাংবিধানিক বৈধতার মোড়কে মুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। মানুষ সেটা বুঝেছিলো, এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছিলো।
কিন্তু গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই চোখ কপালে উঠছিলো। ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা দেখে যে কেউ একটু ভাবলেই বুঝতে পারতো, এই সংখ্যাগুলো কোথা থেকে আসলো। দেশের মানুষ যখন মাঠে নেমে এই সনদের বিরোধিতা করছে, সভা সমাবেশে প্রত্যাখ্যান করছে, তখন কীভাবে এতো এতো ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লো, সেটা নিয়ে সংশয় ছিলো অনেকের মধ্যেই।
এখন সেই সংশয়ের একটা খণ্ডিত স্বীকৃতি মিললো। নির্বাচন কমিশন চুপচাপ একটা সংশোধনী গেজেট বের করলো, যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে নয় লাখ ‘হ্যাঁ’ ভোট কমে গেছে। ‘না’ ভোটও কিছুটা কমেছে। মোট হিসেবে দশ লাখের বেশি ভোট বাতাসে মিলিয়ে গেছে। আর কমিশন এই বিশাল সংশোধনীর জন্য কোনো কারণ বলেনি। শুধু লিখেছে, কমিশনের আদেশক্রমে এটা করা হয়েছে।
এই যে নির্লজ্জ নীরবতা, এটাই আসলে সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি। দশ লাখ ভোট হঠাৎ কমে যায় না, কোনো কারণ ছাড়া। ভোটের বাক্সে যা ঢোকানো হয়েছিলো, তার একটা অংশ যে বেঠিক জায়গায় ঢোকানো হয়েছিলো, সেটা এখন হয়তো মেলাতে পারছে না কমিশন নিজেই।
মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো রাজনৈতিক প্রকল্পটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা মিথ্যার ওপর। বিদেশী অর্থের সহায়তায়, চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণে এবং সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থনে ২০২৪ সালে যা হয়েছে, সেটা গণঅভ্যুত্থান ছিলো না। সেটা ছিলো একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যার মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটা সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাত করা হয়েছে।
জুলাই সনদ ছিলো সেই উৎখাতকে বৈধতা দেওয়ার একটা ধূর্ত কৌশল। ভাবখানা এমন ছিলো, জনগণকে দিয়ে একটা ‘হ্যাঁ’ বলিয়ে নিতে পারলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে, ইতিহাসে লেখা থাকবে যে জনগণ সমর্থন করেছিলো। কিন্তু জনগণ সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তাই ভোটবাক্সে যা দরকার, সেটা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
এখন সেই ভোটের হিসেব মেলাতে গিয়ে নিজেরাই ধরা পড়ে গেছে। দশ লাখ ভোট কমানোর পরেও যা থাকছে, সেটার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের বাইরে নয়। কারণ হিসেবটা যদি মেলানোই না যেতো, তাহলে এই সংশোধনীর দরকার হতো না।
ইউনূস সাহেব নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, ক্ষুদ্রঋণের কাজের জন্য। সেই মানুষটাই এখন একটা দেশের ক্ষমতায় বসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের ভেক ধরে অগণতান্ত্রিক কাজ করে চলেছেন। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য লজ্জার না, আন্তর্জাতিক মহলের জন্যও একটা বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে এই অধ্যায়টা যখন উন্মোচিত হচ্ছে একটু একটু করে, মানুষ বুঝছে যে তারা যা সন্দেহ করেছিলো তা মিথ্যা ছিলো না। আর এই সংশোধনী গেজেটটা সম্ভবত শেষ স্বীকারোক্তি নয়, শুরু মাত্র।

