২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনকারী ও তৎকালীন সমন্বয়কদের বিভিন্ন স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য নতুন করে ভাইরাল হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—জুলাইয়ের সহিংসতায় কি দাঙ্গাকারীদের চেয়ে পুলিশের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতিই ছিল বেশি সুপরিকল্পিত?
সম্প্রতি ইন্টারনেটে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, শত শত পুলিশকে তাদের ইন্ধনেই জবাই করা হয়েছে। ডিবিসি নিউজের এক টকশোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম সরাসরি বলেন, “মেট্রোরেলে আগুন না দিলে কিংবা পুলিশ হত্যা না করা হলে এতো সহজে বিপ্লব অর্জন করা যেত না।”
একইভাবে হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সমন্বয়ক মাহদী হাসান স্বীকার করেছেন যে, তারা থানা পুড়িয়েছেন এবং এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ গত ৩ জানুয়ারি শাহবাগের এক কর্মসূচিতে বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেন।
তিনি দাবি করেন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তারেক রহমান, জামায়াত আমির শফিকুর রহমান, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস ও নাহিদরা জড়িত। নিজের ও সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত রিফাত রশিদ রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের রক্ষার গ্যারান্টি দাবি করেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যার ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের অঙ্গীকার করেছেন, যাকে সমর্থন জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এই বিচার প্রক্রিয়ার খবরে কপালে ভাঁজ পড়েছে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের। তিনি পুলিশ হত্যার বিচারের আগে ‘শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের’ বিচার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন এবং রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনে বিএনপি পুলিশ হত্যা করেছে।
সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন চ্যানেল ওয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, তার কাছে এমন কিছু ছবি আছে যেখানে দেখা গেছে হেলিকপ্টারে করে কিছু ব্যক্তিদের নেওয়া হচ্ছে যাদের শারীরিক গঠন বা চেহারা বাংলাদেশিদের মতো নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এরা কারা? এদের গঠন আমাদের মতো না।” তিনি ইঙ্গিত দেন যে তদন্ত করলে এতে ভারতীয় স্নাইপারদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্দোলনের নামে পুলিশ হত্যা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস কোনোভাবেই আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারে না। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, জনরোষকে ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের শামিল।
বর্তমানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জুলাইয়ের অমীমাংসিত মামলাগুলো নিয়ে পুনরায় সক্রিয় হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অনেক মামলায় এনসিপির শীর্ষ নেতাদের নাম জড়িয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিচার প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হলে আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

