ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর ‘জেলহত্যা’র এক নতুন ও ভয়ংকর অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। জুলাই দাঙ্গার পর থেকে সুকৌশলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ পটুয়াখালী ও নারায়ণগঞ্জের দুই নেতার মৃত্যুতে এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেখানো ‘নির্মূলের পথে’ এখন বিএনপিও কি শরিক হচ্ছে?
শুক্রবার বিকেলে পটুয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দি দুমকি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম খাঁন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ২০১৫ সালের একটি রাজনৈতিক মামলায় গত ১১ আগস্ট তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসক একে হৃদরোগজনিত মৃত্যু বলে দাবি করছেন, তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘদিন অসুস্থ এবং হার্টে ব্লক থাকা একজন কর্মীকে কেন পর্যাপ্ত উন্নত চিকিৎসা না দিয়ে কারান্তরীণ রাখা হলো?
এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মনির হোসেন সিকদার (৬০)। গত ১২ নভেম্বর তাকে স্রেফ ‘নাশকতার আশঙ্কা’ বা সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, তিন মাস ধরে বিনা বিচারে আটকে রেখে এবং শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ বা কারা কর্তৃপক্ষ ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’র তকমা দিলেও নিহতদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন এবং চিকিৎসার চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকরা একে রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার ‘জাকার্তা মেথড’-এর সাথে তুলনা করছেন, যেখানে প্রতিপক্ষকে জেলখানায় নিয়ে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’র নাটক সাজানো হয়।
জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর দেশে মবতন্ত্র ও উগ্রবাদের উত্থান ঘটলেও তারা নাশকতার পথে হাঁটেনি। অথচ তথাকথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ প্রবর্তক দাবি করা বিএনপি কি এখন এই জেলহত্যার রাজনীতিকে মৌন সমর্থন দিচ্ছে?
সিরাজগঞ্জে আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চু (৮০) কিংবা গাইবান্ধার তারিক রিফাতের মতো প্রবীণ ও অসুস্থ নেতাদের কারাগারে আটকে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া ১৯৭৫ সালের জেলহত্যার কালো অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
গণতন্ত্র রক্ষার দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ ঠেকানোর নামে এই ‘কাস্টডিয়াল ডেথ’ বা হেফাজতকালীন হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর এক চরম চপেটাঘাত। এই নৃশংসতা বন্ধ না হলে দেশ আরও বড় রক্তপাতের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

