Saturday, February 28, 2026

লুটেরা চরিত্র কি কখনো ঢাকা যায় নোবেলের আড়ালে?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার মসনদে বসলেন, তখন তাঁকে ঘিরে একটা বিশেষ বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই মানুষটি সৎ, নিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক। নোবেল বিজয়ী এক মহামানব। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তিনিই নাকি একমাত্র ভরসা। সেই বয়ান গিলেছিল অনেকেই। এখন সেই বয়ানের মোড়ক খুলে যাচ্ছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যা, সেটা দেখতে ঠিক মহানুভবতার মতো না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের দরজায় এখন শত শত অভিযোগের স্তূপ। ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা বিদায় নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযোগগুলো জমা পড়তে শুরু করেছে। রেকর্ড হবে বলে দুদকের কর্মকর্তারাও অবাক। প্রায় প্রতিটি উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ এসেছে। মানে পুরো সরকারটাই একটা বিশাল দুর্নীতির আখড়া ছিল বলে যা বেরিয়ে আসছে, সেটা নিয়ে আর সংশয় রাখার উপায় নেই।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিলই একটা মিথ্যার ভিত্তিতে। বিদেশি অর্থ, ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থন মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে দাঙ্গা পরিচালিত হয়েছিল, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল না। সেটা ছিল পরিকল্পিত একটা ক্যু। নির্বাচিত সরকারকে বেআইনিভাবে উৎখাত করে একটা অনির্বাচিত গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই দখলদারির সামনের মুখ হয়েছিলেন ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল, আয়কর ফাঁকির মামলা ছিল।

ইউনূসের নিজের বিরুদ্ধে এখন যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলো পড়লে বোঝা যায়, মানুষটি নিজের নামে ট্রাস্ট খুলে গ্রামীণ কল্যাণ আর গ্রামীণ টেলিকমের টাকা সরিয়েছেন বলে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের লোকজনই দাবি করছেন। সেই ট্রাস্টের উদ্দেশ্য নাকি একটাই, নিজের পরিবারের দেখাশোনা করা। মানে দাতব্যের মোড়কে সম্পূর্ণ পারিবারিক সম্পদ রক্ষার একটা কৌশল। এর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে একাধিক। যে মানুষটি দেশের গরিব মানুষদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে বিশ্বজোড়া নাম কামিয়েছেন, তিনি নিজেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বিদেশে টাকা পাঠাচ্ছিলেন। এই বৈপরীত্যটা হজম করতে একটু কষ্ট হয় বৈকি।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। টেলিভিশনের টকশোতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত মুখ। সেই মানুষটি আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে পুরো বিচারব্যবস্থাকে একটা দোকানে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ। জামিন বিক্রি হতো তাঁর দফতর থেকে। একটি শিল্পগোষ্ঠীর সিইও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাইবোনের সম্পত্তি গ্রাস করেছিলেন, পিবিআই তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছিল, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে সেই আসামিকে জামিন পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। গান বাংলার তাপসের জামিনের ক্ষেত্রেও একই কায়দায় বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা তথ্যপ্রমাণসহ দুদকে জানিয়েছেন। ১৮ মাসে এভাবে কতজনের জামিন বিক্রি হয়েছে সেই হিসাব করাটাই এখন দুদকের কাজ।

বিচারক বদলির বাজারও তিনি বেশ ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। ঢাকা আর আশপাশের এলাকায় একজন বিচারককে বদলি করতে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ। সাব রেজিস্ট্রার পদায়নেও একই কাণ্ড। উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, সাভারের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বদলি পেতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হতো। বিচার বিভাগকে এভাবে পণ্যে পরিণত করা হলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার কোথায় পাবেন, সেই প্রশ্নটা এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।

পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশে পরিবেশ আন্দোলনের পরিচিত মুখ। বেলার প্রধান হিসেবে বছরের পর বছর পরিবেশ রক্ষার লড়াই করেছেন বলে পরিচিতি তাঁর। কিন্তু উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ সরানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অন্যের জমি জোর করে দখলের অভিযোগও আছে। আলাদা একটা অভিযোগ এসেছে তাঁর স্বামীকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সম্পত্তি তাঁর স্বামী দেখাশোনা করছেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে দুদকের কাছে। পরিবেশ বাঁচানোর স্লোগান দিয়ে যিনি ক্ষমতায় এলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আসাটা নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন একটা খাতের যেখানে টাকার প্রবাহ বিশাল। সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যুৎ আর জ্বালানি খাত বাংলাদেশে এমনিতেই দুর্নীতির পুরনো আখড়া। সেই আখড়াটাকে আরও একটু সমৃদ্ধ করে গেছেন বলে যা অভিযোগ আসছে, সেটা সত্যি হলে এই মানুষটির ভূমিকা বেশ ভালোভাবেই খতিয়ে দেখার দরকার আছে।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে টেন্ডার জালিয়াতি আর হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম নিয়ে। স্বাস্থ্যখাত বাংলাদেশের সবচেয়ে সংকটগ্রস্ত জায়গাগুলোর একটা। সেখানে মানুষ চিকিৎসার অভাবে মরে। আর সেই খাতের টাকা যদি টেন্ডার বাণিজ্যে চলে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা সেই রোগীদেরই হয় যাদের কথা বলে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতাটাকে ব্যবহার করেছিলেন ঘুষ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে বলে অভিযোগ এসেছে। গণমাধ্যম যে দেশে স্বাধীনভাবে চলবে, সেই গণমাধ্যমের লাইসেন্স যদি ঘুষের বিনিময়ে বিক্রি হয়, তাহলে সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসলে কার স্বার্থে কাজ করে সেটা বোঝা কঠিন না।

আর সবশেষে আসিফ মাহমুদ। জুলাইয়ের আন্দোলনের মুখ, তরুণ প্রজন্মের প্রতীক বলে যাঁকে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এসেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। এবং এই অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই করেছেন ভুক্তভোগীরা নিজেদের নাম আর ঠিকানা দিয়ে, সঙ্গে দিয়েছেন তথ্যপ্রমাণও। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার সরাসরি অভিযোগ আছে। বিটকয়েনে অবৈধ লেনদেন আর বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে। যে তরুণ বিপ্লবের আগুনে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছিলেন, তিনি আসলে সেই আগুনটাকে ব্যবহার করেছিলেন নিজের সম্পদ গরম করতে। এটা শুধু একজন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা না, এটা একটা গোটা প্রজন্মের আবেগের সঙ্গে প্রতারণা।

টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কথাটা সত্যি। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করলেন যে এই উপদেষ্টারা ক্ষমতায় থাকাকালীন দুদকের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। সেটাই হলো আসল সমস্যার জায়গা। বাংলাদেশে দুদক কার্যকর হয় শুধু তখনই যখন কেউ ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকলে দুদকের চোখে ঘুম নামে। এই প্যাটার্ন নতুন না। কিন্তু ইউনূস সরকারের ক্ষেত্রে যন্ত্রণাটা বেশি এই কারণে যে, এই সরকার নিজেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করেছিল।

বিদেশি অর্থে পালিত, জঙ্গি সংগঠনের পেশিশক্তিতে ভর করা, সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদে ক্ষমতায় আসা এই সরকার আসলে চুরি করতেই গঠিত হয়েছিল। আর সেই কাজটা তারা বেশ সাফল্যের সঙ্গেই করেছে। এখন যখন অভিযোগের পাহাড় জমছে, তখন প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে দুদক তদন্ত করবে কি না। প্রশ্নটা হলো, যে দেশে ক্ষমতাবানরা লুটে যায় আর দুদক ঘুমিয়ে থাকে, সেই দেশে জবাবদিহিতার জায়গাটা আদৌ আছে কি না।

চোরের হাতে দেশের চাবি দিলে এটাই হয়। চাবি ফেরত পাওয়ার পর দেখা যায়, তালার সঙ্গে ঘরের সবকিছুই গেছে।
https://www.bd-pratidin.com/first-page/2026/02/26/1221309

ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার মসনদে বসলেন, তখন তাঁকে ঘিরে একটা বিশেষ বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই মানুষটি সৎ, নিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক। নোবেল বিজয়ী এক মহামানব। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তিনিই নাকি একমাত্র ভরসা। সেই বয়ান গিলেছিল অনেকেই। এখন সেই বয়ানের মোড়ক খুলে যাচ্ছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যা, সেটা দেখতে ঠিক মহানুভবতার মতো না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের দরজায় এখন শত শত অভিযোগের স্তূপ। ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা বিদায় নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযোগগুলো জমা পড়তে শুরু করেছে। রেকর্ড হবে বলে দুদকের কর্মকর্তারাও অবাক। প্রায় প্রতিটি উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ এসেছে। মানে পুরো সরকারটাই একটা বিশাল দুর্নীতির আখড়া ছিল বলে যা বেরিয়ে আসছে, সেটা নিয়ে আর সংশয় রাখার উপায় নেই।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিলই একটা মিথ্যার ভিত্তিতে। বিদেশি অর্থ, ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থন মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে দাঙ্গা পরিচালিত হয়েছিল, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল না। সেটা ছিল পরিকল্পিত একটা ক্যু। নির্বাচিত সরকারকে বেআইনিভাবে উৎখাত করে একটা অনির্বাচিত গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই দখলদারির সামনের মুখ হয়েছিলেন ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল, আয়কর ফাঁকির মামলা ছিল।

ইউনূসের নিজের বিরুদ্ধে এখন যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলো পড়লে বোঝা যায়, মানুষটি নিজের নামে ট্রাস্ট খুলে গ্রামীণ কল্যাণ আর গ্রামীণ টেলিকমের টাকা সরিয়েছেন বলে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের লোকজনই দাবি করছেন। সেই ট্রাস্টের উদ্দেশ্য নাকি একটাই, নিজের পরিবারের দেখাশোনা করা। মানে দাতব্যের মোড়কে সম্পূর্ণ পারিবারিক সম্পদ রক্ষার একটা কৌশল। এর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে একাধিক। যে মানুষটি দেশের গরিব মানুষদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে বিশ্বজোড়া নাম কামিয়েছেন, তিনি নিজেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বিদেশে টাকা পাঠাচ্ছিলেন। এই বৈপরীত্যটা হজম করতে একটু কষ্ট হয় বৈকি।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। টেলিভিশনের টকশোতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত মুখ। সেই মানুষটি আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে পুরো বিচারব্যবস্থাকে একটা দোকানে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ। জামিন বিক্রি হতো তাঁর দফতর থেকে। একটি শিল্পগোষ্ঠীর সিইও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাইবোনের সম্পত্তি গ্রাস করেছিলেন, পিবিআই তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছিল, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে সেই আসামিকে জামিন পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। গান বাংলার তাপসের জামিনের ক্ষেত্রেও একই কায়দায় বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা তথ্যপ্রমাণসহ দুদকে জানিয়েছেন। ১৮ মাসে এভাবে কতজনের জামিন বিক্রি হয়েছে সেই হিসাব করাটাই এখন দুদকের কাজ।

বিচারক বদলির বাজারও তিনি বেশ ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। ঢাকা আর আশপাশের এলাকায় একজন বিচারককে বদলি করতে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ। সাব রেজিস্ট্রার পদায়নেও একই কাণ্ড। উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, সাভারের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বদলি পেতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হতো। বিচার বিভাগকে এভাবে পণ্যে পরিণত করা হলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার কোথায় পাবেন, সেই প্রশ্নটা এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।

পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশে পরিবেশ আন্দোলনের পরিচিত মুখ। বেলার প্রধান হিসেবে বছরের পর বছর পরিবেশ রক্ষার লড়াই করেছেন বলে পরিচিতি তাঁর। কিন্তু উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ সরানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অন্যের জমি জোর করে দখলের অভিযোগও আছে। আলাদা একটা অভিযোগ এসেছে তাঁর স্বামীকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সম্পত্তি তাঁর স্বামী দেখাশোনা করছেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে দুদকের কাছে। পরিবেশ বাঁচানোর স্লোগান দিয়ে যিনি ক্ষমতায় এলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আসাটা নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন একটা খাতের যেখানে টাকার প্রবাহ বিশাল। সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যুৎ আর জ্বালানি খাত বাংলাদেশে এমনিতেই দুর্নীতির পুরনো আখড়া। সেই আখড়াটাকে আরও একটু সমৃদ্ধ করে গেছেন বলে যা অভিযোগ আসছে, সেটা সত্যি হলে এই মানুষটির ভূমিকা বেশ ভালোভাবেই খতিয়ে দেখার দরকার আছে।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে টেন্ডার জালিয়াতি আর হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম নিয়ে। স্বাস্থ্যখাত বাংলাদেশের সবচেয়ে সংকটগ্রস্ত জায়গাগুলোর একটা। সেখানে মানুষ চিকিৎসার অভাবে মরে। আর সেই খাতের টাকা যদি টেন্ডার বাণিজ্যে চলে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা সেই রোগীদেরই হয় যাদের কথা বলে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতাটাকে ব্যবহার করেছিলেন ঘুষ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে বলে অভিযোগ এসেছে। গণমাধ্যম যে দেশে স্বাধীনভাবে চলবে, সেই গণমাধ্যমের লাইসেন্স যদি ঘুষের বিনিময়ে বিক্রি হয়, তাহলে সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসলে কার স্বার্থে কাজ করে সেটা বোঝা কঠিন না।

আর সবশেষে আসিফ মাহমুদ। জুলাইয়ের আন্দোলনের মুখ, তরুণ প্রজন্মের প্রতীক বলে যাঁকে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এসেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। এবং এই অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই করেছেন ভুক্তভোগীরা নিজেদের নাম আর ঠিকানা দিয়ে, সঙ্গে দিয়েছেন তথ্যপ্রমাণও। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার সরাসরি অভিযোগ আছে। বিটকয়েনে অবৈধ লেনদেন আর বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে। যে তরুণ বিপ্লবের আগুনে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছিলেন, তিনি আসলে সেই আগুনটাকে ব্যবহার করেছিলেন নিজের সম্পদ গরম করতে। এটা শুধু একজন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা না, এটা একটা গোটা প্রজন্মের আবেগের সঙ্গে প্রতারণা।

টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কথাটা সত্যি। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করলেন যে এই উপদেষ্টারা ক্ষমতায় থাকাকালীন দুদকের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। সেটাই হলো আসল সমস্যার জায়গা। বাংলাদেশে দুদক কার্যকর হয় শুধু তখনই যখন কেউ ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকলে দুদকের চোখে ঘুম নামে। এই প্যাটার্ন নতুন না। কিন্তু ইউনূস সরকারের ক্ষেত্রে যন্ত্রণাটা বেশি এই কারণে যে, এই সরকার নিজেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করেছিল।

বিদেশি অর্থে পালিত, জঙ্গি সংগঠনের পেশিশক্তিতে ভর করা, সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদে ক্ষমতায় আসা এই সরকার আসলে চুরি করতেই গঠিত হয়েছিল। আর সেই কাজটা তারা বেশ সাফল্যের সঙ্গেই করেছে। এখন যখন অভিযোগের পাহাড় জমছে, তখন প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে দুদক তদন্ত করবে কি না। প্রশ্নটা হলো, যে দেশে ক্ষমতাবানরা লুটে যায় আর দুদক ঘুমিয়ে থাকে, সেই দেশে জবাবদিহিতার জায়গাটা আদৌ আছে কি না।

চোরের হাতে দেশের চাবি দিলে এটাই হয়। চাবি ফেরত পাওয়ার পর দেখা যায়, তালার সঙ্গে ঘরের সবকিছুই গেছে।
https://www.bd-pratidin.com/first-page/2026/02/26/1221309

আরো পড়ুন

সর্বশেষ