বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (আগস্ট ২০২৪ – ফেব্রুয়ারি ২০২৬), যা প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে ক্ষমতায় এসেছিল। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সরকার সংস্কার, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু শাসনামলের শেষ দিকে (বিশেষ করে ২০২৫-২০২৬) উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বার্থের সংঘাত এবং অর্থপাচারের অভিযোগ উঠে জনমনে ব্যাপক হতাশা তৈরি করে। এসব অভিযোগ মিডিয়া রিপোর্ট, রাজনৈতিক দলের দাবি এবং নাগরিক সমাজের সমালোচনায় বারবার উঠে এসেছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বেশিরভাগ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো চূড়ান্ত আদালতী রায় বা দোষী সাব্যস্ততা এখনো (ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) প্রকাশিত হয়নি।
প্রধান অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বজনপ্রীতি। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে নিয়োগ দেওয়া হয় গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক অ্যাক্টিং এমডি হিসেবে, যিনি স্বাস্থ্য খাতে কোনো বিশেষজ্ঞতা রাখেন না। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এটিকে “ইউনূসের ভাই ব্রাদার কোটা” বলে অভিহিত করেছেন এবং পদত্যাগ ও বেতন ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া ইউনূসের ভাগ্নে অপূর্ব জাহাঙ্গীরকে ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে (গ্রামীণ ব্যাংক, গ্রামীণ টেলিকম) ২০২৯ পর্যন্ত কর অব্যাহতি, সরকারি শেয়ার ২৫% থেকে ১০%-এ নামানো, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি অনুমোদন, রপ্তানি লাইসেন্স এবং ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমতি দেওয়ায় স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতটি এক সিন্ডিকেটের চাপে পড়েছিল। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিল নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহচর লামিয়া মোর্শেদ, যিনি বর্তমানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে রয়েছেন।
সূত্র মতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থে বারবার বিদেশ গেছেন ড. ইউনূস। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই ইউনূস তার নিকটজনদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে থাকেন। তারই ধারাবাহিকতায় শপথ নেওয়ার পরপরই ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদকে নিয়োগ দেওয়া হয় এসডিজি মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে। অথচ এসডিজি বাস্তবায়নে তার কোনো উল্লেখযোগ্য দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনশক্তি রপ্তানির অনুমোদন পায় ড. ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (GESL)। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল, যা তখন তা বাতিল হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি।
এই অনুমোদনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোর্শেদের প্রভাব ব্যবহারের প্রসঙ্গ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি জনশক্তি রপ্তানির নামে মূলত সিন্ডিকেট ব্যবসায় যুক্ত এবং দেশের অন্যান্য এজেন্সিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে। মিনি-স্টেডিয়াম প্রকল্পের (শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামসহ) ব্যয় ১৫৮% বাড়িয়ে ১২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ট্রান্সফার-পোস্টিংয়ে কোটি টাকা ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতির অভিযোগে দুদক তদন্ত করে তাকে বরখাস্ত করেছে। কিছু রিপোর্টে আসিফের বিরুদ্ধে ৪ দেশে (দুবাইসহ) ১১ হাজার কোটি টাকা অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে অফশোর কোম্পানি, বিলাসবহুল ভিলা-ফ্ল্যাট কেনার কথা বলা হয়েছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ বিরোধী দল হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ তুলে দুদক তদন্ত দাবি করেছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে দুদক তদন্ত চালিয়েছে। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সাবেক একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ অনিয়ম এবং ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। দুদক অভিযান চালিয়ে আতিক ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ ধরনের দুর্নীতির দায় উপদেষ্টারা এড়াতে পারেন না। আতিক পরে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
৫৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের নজরদারিতে থাকা ফয়েজের সাথে ইউনূসেরও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত থাকা সন্দেহ একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। গ্রামীণফোনের ৩৯ শতাংশের মালিকানা রয়েছে ফ্যাসিস্ট ইউনূস নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি গ্রামীণ টেলিকমের। ফয়েজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ইউনূসের স্বার্থ চরিতাত্র করতেই গ্রামীণফোনকে নীতিমালার বাইরে বিভিন্ন সুবিধাদি দিয়েছে এই ব্যক্তি।
নির্বাচনের আগে অনেকটা একচেটিয়াভাবেই তড়িঘড়ি করে ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ গ্রামীণফোনের নামে ১৩ বছর মেয়াদে বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করেছে ফয়েজ আহমদ তৈয়ব। এছাড়াও নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠদের পদায়ন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিটিসিএল এর অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিলো ১৬৫ কোটি টাকা। কোন কারণ ছাড়াই ফয়েজ আহমদ তৈয়বের উদ্যোগে ব্যয় বাড়িয়ে ৩২৬ কোটি টাকা ধার্য করা হয় শুধুমাত্র লোপাটের উদ্দেশ্যে।
জানা যায়, দেশত্যাগের সময়ে তৈয়্যবের নিকট কোন জিও বা সরকারি অনুমতি ছিলো না। এমনকি এই দুর্নীতিবাজের দেশত্যাগে বিস্ময় প্রকাশ করেছে স্বয়ং দুদকও।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার ভাই, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম মাহিকে ঘিরে বিতর্ক ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বনি আমিন।
২৮ জুলাই এক ফেসবুক পোস্টে বনি আমিন দাবি করেন, মাহবুব আলমের অস্ট্রেলিয়ান ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, অস্ট্রেলিয়ান ট্রানজেকশন রিপোর্টস অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেন্টার (AUSTRAC) তদন্ত শুরু করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে মাহফুজ আলম তার ভাইয়ের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক ‘লবিং ও ফাইলিং’য়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন।
আগস্ট ২০২৫-এ সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার দাবি করেন, অন্তত ৮ জন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। সরকার এগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। টিআইবি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা রয়েছে এবং বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় অবস্থান আরও খারাপ হয়েছে। দুদকের অনেক তদন্ত (যেমন এপিএস-পিওদের ফাইল) ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল সম্পদের হিসাব প্রকাশ। ইউনূস ২০২৪-এর আগস্টে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে উপদেষ্টারা দ্রুত সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। অক্টোবর ২০২৪-এ নীতিমালা জারি হলেও, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ (নির্বাচনের ঠিক আগে) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সম্পদ ১৫ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি (এক বছরে প্রায় ১.৬ কোটি বৃদ্ধি)। তবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজের হিসাব বাদ পড়েছে। তার কোনো সম্পদের হিসা প্রকাশ করা হয়নি। আরেক উপদেষ্টা লুৎফে সিদ্দিকীর সম্পদের হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের ১৮ জন উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে এবং ৩ জনের কমেছে।
সম্পদ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চার উপদেষ্টার। তাঁরা হলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার ও অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তাঁদের সম্পদ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে।
অধ্যাপক ইউনূসের ১ কোটি ৬১ লাখ, আদিলুর রহমান খানের ১ কোটি ৫৪ লাখ, বিধান রঞ্জনের ১ কোটি ৩৬ লাখ ও ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার সম্পদ বেড়েছে।
তৌহিদ হোসেন, সি আর আবরার, শেখ বশিরউদ্দীন, আলী ইমাম মজুমদারের সম্পদ বেড়েছে ৫২ থেকে ৬২ লাখ টাকা পর্যন্ত।
শারমীন এস মুরশিদ, এম সাখাওয়াত হোসেন, আ ফ ম খালিদ হোসেন, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফারুক–ই–আজম, ফরিদা আখতার, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও অধ্যাপক আসিফ নজরুলের সম্পদ বেড়েছে ১৩ থেকে ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত।
মাহফুজ আলম (সাবেক উপদেষ্টা), সালেহউদ্দিন আহমেদ ও নূরজাহান বেগমের সম্পদ বেড়েছে ৪ থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত।
উপদেষ্টাদের স্বামী/স্ত্রীর মধ্যে সম্পদ বেশি বেড়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর স্ত্রী নুশরাত ইমরোজ তিশার। তিনি একজন অভিনেত্রী। তাঁর সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ। তিশার মোট সম্পদ প্রায় ৩ কোটি।
শারমীন মুরশিদের স্বামী হুমায়ুন কাদের চৌধুরীর সম্পদ বেড়েছে ১ কোটির বেশি। তাঁর মোট সম্পদ ৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বেশি।
উপদেষ্টাদের মধ্যে সালেহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী পারভীন আহমেদের ৭৫ লাখ, আদিলুর রহমান খানের স্ত্রী সায়রা রহমান খানের ৬৪ লাখ, সি আর আবরারের স্ত্রী তাসনিম এ সিদ্দিকীর ৪৭ লাখ ও আসিফ নজরুলের স্ত্রী শীলা আহমেদের সম্পদ ৪৪ লাখ টাকা বেড়েছে।
দুদকে শত শত অভিযোগ
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করা সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন–এর কার্যালয়ে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে; অধিকাংশ অভিযোগই নাম-পরিচয়বিহীন হলেও কিছু অভিযোগকারী নিজেদের পরিচয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংযুক্ত করেছেন।
দুদক সূত্র জানায়, অন্যান্য অভিযোগের মতোই এগুলোও প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দেখা হবে। যেসব অভিযোগে আমলযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে টিআইবি এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রয়োজন হলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, যাতে অভিযোগের নামে কাউকে হয়রানি করা না হয় এবং যেসব অভিযোগ আমলযোগ্য নয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও দুদককে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ এসেছে। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগগুলোর মধ্যে গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বিষয় উল্লেখযোগ্য। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, একটি ব্যক্তিগত ট্রাস্ট গঠন করে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ এবং আয়কর ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই ট্রাস্টের মাধ্যমে পারিবারিক দেখভালের আড়ালে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের দাবিও কিছু অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে মামলা ও জামিন বাণিজ্য, বিচারক ও সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয় রয়েছে। একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একটি শিল্পগ্রুপ সংশ্লিষ্ট মামলায় বিপুল অর্থের বিনিময়ে জামিন নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে যে, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলি ও সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তাধীন রয়েছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছে। একটি অভিযোগে তার স্বামীর ভূমিকা সম্পর্কেও তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অনিয়মিত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি ও হাসপাতাল কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ এসেছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। দুদকের একটি সূত্রের দাবি, তার বিরুদ্ধে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের একটি অংশ নাম-ঠিকানা ও নথিপত্র সংযুক্ত করেছেন। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়া, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ জমা পড়েছে। এভাবে প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই কোনো না কোনো অভিযোগ এসেছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কিছু অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু তখন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি—এমন সমালোচনা ছিল। এখন যেহেতু তারা দায়িত্বে নেই, তাই তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও কার্যকর হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তই জনআস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতি—দুই ক্ষেত্রেই পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে একদিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখন কারখানায় ঢুকতে, অফিসে এমনকি রাস্তায় রাস্তায় চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদাবাজরা এসে নিজেদের সরকারি দলের লোক বলে পরিচয় দিচ্ছে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে নতুন সরকারের কাছ থেকে একটি কঠোর বার্তার প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বৈপরীত্য নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

