আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম-কে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সাবেক আইজিপিসহ একাধিক মামলার আসামিকে রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে প্রাণহানির ঘটনায় গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন-কে রাজসাক্ষী করার জন্য হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, ধানমন্ডিতে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে বসে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির-এর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
সুলতান মাহমুদের দাবি অনুযায়ী, সাবেক আইজিপিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধানমন্ডির তদন্ত কার্যালয়ে আইনজীবী শিশির মনির নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। তাঁর অভিযোগ, ‘দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে নিরাপদে পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।’
সুলতান মাহমুদ আরও অভিযোগ করেন, গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ায় ভ্যানে লাশ পোড়ানোর মামলার এক আসামির স্ত্রী একটি ‘ভারী ব্যাগ’ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজি মোনাওয়ার হুসাইন তামিম-এর কক্ষে প্রবেশ করেন।
তিনি বিষয়টি চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে অবহিত করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন। বরং বিষয়টি জানানোয় তাকে তিরস্কার করা হয়। পরে ওই মামলার আসামি আফজালকে রাজসাক্ষী করা হয় এবং চূড়ান্ত বিচারে খালাস দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সুলতান মাহমুদ আরও অভিযোগ করেন, চানখাঁরপুলে ছাত্র-জনতার ওপর এসআই আশরাফুলের সরাসরি গুলি চালানোর ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে।
এ ছাড়া রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কয়েকজন সাক্ষী আদালতে এসে এসি ইমরানের নাম উল্লেখ করলেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পোস্টে সুলতান মাহমুদের অভিযোগের জবাবে এক ব্যক্তি প্রশ্ন তোলেন— তিনি নিজেও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে দায় এড়াতে পারেন কি না। উত্তরে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ দিলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাইব্যুনালের ভেতরে আসামি নির্বাচন ও রাজসাক্ষী নির্ধারণ নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেনের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মতবিরোধের কারণেই বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে প্রসিকিউটরদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির অভিযোগের জেরেই শেষ পর্যন্ত চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

