মুহাম্মদ ইউনূস যখন বিদেশে বক্তৃতা দেন, তখন তার কণ্ঠে একটা বিশেষ কম্পনের ওঠানামা থাকে। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা টাইপের শব্দগুলা যখন উচ্চারণ করেন। শব্দগুলো তার মুখে খুব মানায়। নোবেল বিজয়ীর মুখ থেকে এই শব্দগুলো বেরোলে পশ্চিমা সাংবাদিকরা মাথা নাড়েন, হাততালি পড়ে। কিন্তু দেশে ফিরে এই মানুষটা ঠিক কী করেন?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে যা বললেন, তা পড়লে বোঝা যায়।
ইউনূস ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। প্রতিটা সফরের পর রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা বাংলাদেশের সংবিধানের সরাসরি বিধান। একটাও পালন করেননি। একবারও বঙ্গভবনে যাননি। এটা ভুলে যাওয়ার বিষয় না, অজ্ঞতার বিষয় না। এটা সচেতন অবজ্ঞা। যে মানুষ জবাবদিহিতার কথা বলতে বলতে বিমানে ওঠেন, তিনি সংবিধানের সবচেয়ে প্রাথমিক বাধ্যবাধকতাটুকুও মানার প্রয়োজন বোধ করেননি।
১৩৩টা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে দেড় বছরে। রাষ্ট্রপতিকে একটার বিষয়েও জানানো হয়নি। আমেরিকার সাথে যে চুক্তি হয়েছে, যেটা নিয়ে দেশে এত কথা হচ্ছে, সেটার বিষয়েও রাষ্ট্রপ্রধান অন্ধকারে ছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের হয়ে চুক্তি হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধান জানেন না। এই একটা তথ্য দিয়েই বোঝা যায়, ইউনূসের সরকার আসলে কার হয়ে কাজ করছিল।
তারপর আসুন অপসারণের চেষ্টার কথায়।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্যমতে, তিনবার তাকে সরানোর পাঁয়তারা হয়েছে। একবার বঙ্গভবন ঘেরাও করে মব দিয়ে। একবার রাজনৈতিক দলগুলোকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। আরেকবার সরাসরি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসানোর প্রস্তাব দিয়ে। শেষেরটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কারণ এটা স্রেফ রাজনৈতিক চাপ না, এটা সরাসরি অবৈধ ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা। সেই বিচারপতি রাজি না হওয়ায় পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রস্তাব দেওয়ার সাহস কোথা থেকে এলো? কোন ভরসায় একটা অনির্বাচিত সরকার দেশের সাংবিধানিক কাঠামো এভাবে ভাঙার কথা ভাবতে পারে?
অক্টোবরে বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের রাতে ড. ইউনূস একটা ফোনও করেননি। নাহিদ ইসলাম করেছেন, সেনাবাহিনী এসেছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সরকারের প্রধান নীরব। এই নীরবতা নিরীহ না। যে মানুষ মব সম্পর্কে জানতেন না বলে দাবি করবেন, তিনি রাত ১২টার সময়ও একটা ফোন করতে পারতেন। করেননি। কারণ ওই পরিস্থিতি তার কাজে লাগছিল।
আর দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামানোর ঘটনাটা আলাদাভাবে বলার দাবি রাখে। এক উপদেষ্টা বিদেশে গিয়ে দূতাবাসে রাষ্ট্রপতির ছবি দেখে রাষ্ট্রদূতকে গালিগালাজ করলেন। সেই রাতেই সারা পৃথিবীর সব বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হলো। এটা বছরের পর বছর ধরে চলে আসা রীতি। রাষ্ট্রপতি স্টেটকে রিপ্রেজেন্ট করেন, তাই দূতাবাসে তার ছবি থাকে। এটা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় না। কিন্তু এক উপদেষ্টার রাগের কারণে এক রাতে পুরো রেওয়াজ শেষ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পৃথিবীতে কোথাও নেই।
এই কাজটা প্রতীকী হলেও এর মানে গভীর। ইউনূসের সরকার বোঝাতে চেয়েছিল, রাষ্ট্রপতি বলে কিছু নেই। রাষ্ট্রটা তাদের, সংবিধান তাদের, সিদ্ধান্ত তাদের।
সমস্যা হলো, এই দেড় বছরে যখন এসব ঘটছিল, তখন দেশের মানুষের একটা বড় অংশ মনে করছিল এটাই বোধহয় পরিবর্তন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের পর যা-ই আসুক, তা ভালো হবে এই বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একটা অনির্বাচিত সরকার সংবিধানকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করে গেছে, যখন দরকার মানবিধান, যখন বাধা হয়েছে তখন উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে।
ইউনূস পিচ্ছিল লোক। কথা বলেন চমৎকার, চরিত্র দেখান নিখুঁত। কিন্তু দেড় বছরের কাজের হিসাব কথা দিয়ে ঢাকা যায় না। রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার সেই হিসাবের একটা ছোট্ট অংশ মাত্র। বাকিটা এখনো বেরোয়নি। হিসাব কষা এখনো অনেক বাকি আছে।

