মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ পুরনো মুখ। বয়সে প্রবীণ, অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক বলেই সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ মিনার প্রসঙ্গে তিনি যে মিথ্যাচার করলেন সেটা দেখে মনে হলো, বয়স আর অভিজ্ঞতা মানুষকে সৎ করে না, কেবল চালাক করে। আর চালাকি যখন ধরা পড়ে যায়, তখন যা বাকি থাকে সেটা কেবল লজ্জা।
ঘটনাটা খুবই সরল। ফুটপাতে বসে থাকার একটা ছবি পোস্ট করে মির্জা ফখরুল দাবি করলেন, ২০১৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে তাদের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে দেওয়া হয়নি। অথচ ফ্যাক্ট ওয়াচ অনুসন্ধান করে দেখিয়েছে, সে বছর তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ঠিকই শহীদ মিনারে গেছেন, ফুলও দিয়েছেন। প্রথম আলো আর যুগান্তরের সেই সময়ের নিউজ রিপোর্টও এটা নিশ্চিত করে। শ্রদ্ধা জানানোর পর মির্জা ফখরুল সেদিন সরকারের বিরুদ্ধে অনেক কথাই বলেছিলেন, কিন্তু শহীদ মিনারে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগ একটিবারের জন্যও করেননি। কারণ বাধা দেওয়াই হয়নি।
এখন প্রশ্ন হলো, এই মিথ্যাটা কেন বলা হলো?
বিএনপির রাজনীতি গত কয়েক বছরে যেদিকে গেছে, সেখানে সত্যের চেয়ে আবেগ বেশি কাজে লাগে। শহীদ মিনারে যেতে দেওয়া হয়নি, এই দাবিটা একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্রোধ তৈরি করে। সেই ক্রোধ রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু ঘটনা যেহেতু সত্য নয়, সেহেতু ডিজিটাল যুগে এই মিথ্যা বেশিক্ষণ টিকে থাকে না। ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বেশ সক্রিয়, পুরনো নিউজ আর ছবি যাচাই করতে সময় লাগে না। ফলে মিথ্যাটা যতটা ক্ষতি করার কথা ছিল তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করল খোদ মির্জা ফখরুলের নিজের ভাবমূর্তির।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এটা নতুন নয়। লন্ডনে থেকে উড়ে এসে দেশ পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া, একের পর এক মামলায় দণ্ডিত হয়েও নিজেকে দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা, আর মাঠের নেতাদের দিয়ে এই ধরনের ফাঁকা দাবি ছড়িয়ে দেওয়া, এটাই এখন বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল হয়ে গেছে। তারেক রহমান নিজে কখনো দায় নেন না, সামনে থাকেন মির্জা ফখরুলের মতো মুখপাত্ররা। ভুল হলে মুখপাত্র বিব্রত হন, তারেক রহমান ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।
বিএনপির জন্মের ইতিহাস সবার জানা। জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দলটা তৈরি করেছিলেন সেটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া দল ছিল না। সামরিক ছায়ায় জন্ম নেওয়া দলগুলোর একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি সেখানে গড়ে ওঠে না। যা বলা হয় সেটাই সত্য, প্রশ্ন করার জায়গা নেই। এই মানসিকতা থেকেই সম্ভবত মির্জা ফখরুলরা ভাবেন, ফুটপাতের একটা ছবি দিলেই মানুষ বিশ্বাস করে ফেলবে।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশে সেটা আর হওয়ার নয়। মানুষ এখন প্রশ্ন করে, যাচাই করে, খোঁজে দেখে। সেই বাস্তবতাটা বিএনপির নেতারা এখনো বুঝে উঠতে পারেননি বলেই মনে হয়।
মির্জা ফখরুলের বয়স, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর দলের মধ্যে তার অবস্থান বিবেচনায় এই ধরনের স্থূল মিথ্যাচার সত্যিই অবাক করে। তবে যে দলের নীতিনির্ধারণ করেন একজন পলাতক দণ্ডিত ব্যক্তি, সেই দলের মুখপাত্রের কাছ থেকে আর কতটুকুই বা প্রত্যাশা করা যায়!

