ইউনুস সরকার মেট্রোরেল ইস্যুতে যা করেছে, সেটাকে নিষ্ক্রিয়তা বললেও কম বলা হয়। ক্ষমতায় এসে দেড় বছর পার করে দিয়েছে, আর এই পুরো সময়টায় জাইকা আর জাপানি ঠিকাদারদের সামনে নতজানু হয়ে বসে রইল। ডিএমটিসিএল নিজেই হিসাব করে দেখিয়েছে, প্রাক্কলিত ব্যয়ের তিন থেকে চারগুণ দর চাইছে ঠিকাদাররা। একটা প্যাকেজে তো ২৯৫ শতাংশ বেশি, আরেকটায় ৩৯১ শতাংশ বেশি। এটা দরপত্র প্রক্রিয়া না, এটা ডাকাতি। আর সেই ডাকাতি দেখেও ইউনুস সরকার জাইকার কাছে বাতিলের অনুমোদন চাইতে গেল, জাইকা বলল বেশি দামেই নিয়োগ দাও, আর সরকার চুপ করে গেল।
যেটা আরও বেশি গায়ে লাগে সেটা হলো, দুটো প্যাকেজে দরপত্রে যে প্যাটার্ন দেখা গেছে সেটা যে কেউ বুঝবে। শিমুজি আর তাইসি-স্যামসাং, এই দুটো জোট একটায় প্রথম হলে অন্যটায় দ্বিতীয়, অন্যটায় প্রথম হলে এটায় দ্বিতীয়। মানে ভাগ করে নিয়েছে। এটা কার্টেলিং, টেক্সটবুক কার্টেলিং। এই সুস্পষ্ট যোগসাজশের বিরুদ্ধে ইউনুস সরকার কী করেছে? জাইকাকে একটা কড়া চিঠি লিখেছে? ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে? না। ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা নাম লুকিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ফিসফিস করেছে, আর মন্ত্রণালয় ফাইল টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছে।
স্বচ্ছতার কথা বলে যারা ক্ষমতায় এলো, তারা একটা প্রকল্পে ৯৩ হাজার কোটির জায়গায় ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকার দর পেল আর ঠায় বসে রইল। ভারত বিদেশি ঋণে মেট্রো বানায়, কিলোমিটারপ্রতি খরচ ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ঢাকায় সেই খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি। পার্থক্যটা কোথায়? ভারত ঋণের শর্তে নিজেদের ক্রয়প্রক্রিয়াকে জিম্মি হতে দেয় না। ইউনুস সরকার সেই সহজ কথাটা জাইকার সামনে বলার সাহস পায়নি। কারণ এই সরকার আসলে ছিল পশ্চিম আর বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের পছন্দের সরকার, তাদের বিরাগভাজন হওয়ার প্রশ্নই ছিল না।
এখন বিএনপি এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। আর এখানেই আসল পরিহাসটা। বিএনপি বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের মেগা প্রকল্পগুলোকে বলে এসেছে মেগা দুর্নীতি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর, এগুলো নিয়ে তারা সংসদে, মাঠে, গলা ফাটিয়েছে। সেই বিএনপিই এখন ক্ষমতায় বসে উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে এমন দুটো মেট্রো প্রকল্প যেগুলোতে যোগসাজশের সুস্পষ্ট আলামত আছে, আর ঠিকাদারের দর অনুমোদিত বাজেটের দ্বিগুণ। এখন তারা কী করবে? তারেক রহমান বক্তৃতায় মনোরেলের স্বপ্ন দেখালেন, কিন্তু যে মেট্রোরেলের কাজ আটকে আছে সেটা নিয়ে কোনো কথা নেই।
লাইন-১-এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরে। ঠিকাদারই এখনো নিয়োগ হয়নি। এই অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হবে, খরচ বাড়বে, আর সেই বাড়তি খরচের বোঝা কার ঘাড়ে পড়বে? যাত্রীর ঘাড়ে। যে মেট্রোরেল এখন চলছে সেটা থেকে বছরে ৪০০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে, আর ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে ৭০০ কোটির কাছাকাছি। নতুন দুটো লাইনের ঋণের বোঝা এর কতগুণ হবে, সেই অঙ্কটা কেউ সামনে রেখে কথা বলছে না।
জাইকার ঋণের গল্পটাও পরিষ্কার হওয়া দরকার। জাপান উন্নয়ন সহায়তার নামে যে ঋণ দেয়, সেই ঋণে এমন প্রকৌশলগত শর্ত থাকে যেটা মূলত জাপানি ঠিকাদারদের জন্য বাজার নিশ্চিত করে। এটা দ্বিপাক্ষিক সাহায্য না, এটা রপ্তানি ভর্তুকির একটা চালাক রূপ। বাংলাদেশ সেই ফাঁদে পড়েছে এবং এখন বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ জাইকার শর্ত পরিবর্তন করতে গেলে জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক দরকষাকষি লাগে, সেই সাহস আওয়ামী লীগও দেখায়নি, ইউনুসও দেখায়নি।
বিএনপি দেখাবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কিন্তু আপাতত যা দেখছি, তারেক রহমান মনোরেলের গল্প বলছেন। মানে পুরনো সমস্যার সমাধান না করে নতুন প্রতিশ্রুতি। রাজনীতির এই চিরপরিচিত কায়দাটা অন্তত পরিবর্তন হয়নি।

