একটা সংগঠনের কথা চিন্তা করুন, যারা ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শাসকের পক্ষ নিয়েছিল, ১৯৭১ সালে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল, আর তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সেই ইতিহাস ঢাকার জন্য প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একটাই কাজ করে যাচ্ছে। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নাকি শিরক, প্রভাতফেরি নাকি হিন্দুয়ানি রীতি, একুশের গান নাকি ইসলামবিরোধী। জামায়াতে ইসলামী আর তাদের ভাবশিষ্য সংগঠনগুলোর এই বয়ান প্রতি বছর নতুন মোড়কে আসে, কিন্তু ভেতরের কাজটা একই।
কাজটা হলো একুশকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়ে দেওয়া।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন? শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কি এই আপত্তি? তাহলে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান ছাত্ররা যখন শহীদদের স্মরণে রোজা রাখলেন, মসজিদে মসজিদে মোনাজাত হলো, আর ঠিক সেই দিনই শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হলো, তখন তো কোনো বিরোধ ঘটেনি। রোজাদার মুসলমান ছাত্র আর হিন্দু ছাত্র একসাথে হেঁটেছে প্রভাতফেরিতে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করেনি, কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করেনি তুমি কোন ধর্মের। ভাষার জন্য যারা মরেছে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কোনো মতাদর্শের ম্যানুয়াল দেখে না। জামায়াত সেই ইতিহাস জানে। জেনেই এড়িয়ে যায়।
কারণটা সহজ। একুশকে যদি হিন্দুয়ানি বা ইসলামবিরোধী বলা যায়, তাহলে ১৯৭১ নিয়ে কথা উঠলে বলা যাবে এই আন্দোলন আসলে ভারতের চক্রান্ত ছিল, পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র ছিল। একটা মিথ্যা আরেকটা মিথ্যাকে আড়াল করে। বায়ান্নকে অস্বীকার করতে পারলে একাত্তরের রাজাকারিকেও একটু হলেও বৈধতা দেওয়া যায়। এই হিসাবটা জামায়াতের রাজনীতির একেবারে ভেতরের সুতো।
আল-বদর, আল-শামস বানিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যায় যে সংগঠন সরাসরি অংশ নিয়েছিল, তার কাছ থেকে একুশের ব্যাখ্যা শোনার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা সেই ব্যাখ্যা দিতে থাকে, আর প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নতুন প্রজন্মের একটা অংশ সেই বয়ান পায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ায়, মাদ্রাসার বয়ানে আসে, মসজিদের ওয়াজে ঢোকে।
এই বয়ানের বিপরীতে দাঁড় করাতে হবে আসল ইতিহাসটা। জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে যে রোজাদার তরুণেরা ফাল্গুন মাসে শহীদদের স্মরণে উপবাস করছে, সেই দৃশ্যটা মনে রাখা দরকার। রমজান না থাকলেও মুসলমান ছাত্ররা রোজা রেখেছিল, কারণ ভাষার জন্য যারা মরেছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই পথটা তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। সেখানে ধর্ম আর সংস্কৃতি আলাদা হয়ে যায়নি, একে অপরের বিরোধও হয়নি। জামায়াত সেই স্বাভাবিকতাকে ভয় পায়। কারণ সেই স্বাভাবিকতার মধ্যে তাদের রাজনীতির কোনো জায়গা নেই।

