এই বক্তব্যটা পড়ে প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো ভুল বুঝলাম। আবার পড়লাম। না, ঠিকই পড়েছি। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সত্যিই বলেছেন যে রাস্তায় পরিবহন থেকে টাকা তোলা চাঁদা না, যদি সেটা “সমঝোতার ভিত্তিতে” হয়। চাঁদা তখনই চাঁদা, যখন বাধ্য করা হয়।
এই যুক্তিটা একটু ধরে রাখা দরকার। কারণ এত সরল একটা কথায় এত বড় একটা স্বীকারোক্তি লুকিয়ে আছে যে না বললেই নয়।
সড়কে যে টাকা তোলা হয় সেটা কীভাবে “সমঝোতা” হয়? সমঝোতা মানে দুটো পক্ষ আলোচনা করে একটা জায়গায় আসে। সেই আলোচনায় দুই পক্ষেরই “না” বলার ক্ষমতা থাকে। একজন ট্রাকচালক বা পরিবহন মালিক কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের লোকদের “না” বলতে পারেন? পারেন না। কারণ না বললে গাড়ি আটকে যাবে, ব্যবসা বন্ধ হবে, ঝামেলা হবে। এই পরিস্থিতির নাম সমঝোতা না, এর নাম জিম্মি।
মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে “যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে।” এই কথাটা একবার ভালো করে পড়ুন। ক্ষমতাসীন দলের সংগঠনের আধিপত্যের মুখে যে টাকা দেওয়া হয়, সেটা সমঝোতা? এটা কোন পৃথিবীর সমঝোতার সংজ্ঞা?
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের গণতন্ত্রের পক্ষের দল বলে দাবি করে এসেছে। তাদের মন্ত্রী আজ যা বললেন সেটা গণতন্ত্রের ভাষা না, এটা চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়ার ভাষা। সড়কে যে অলিখিত চাঁদার ব্যবস্থা দশকের পর দশক ধরে চলছে, সেটাকে “অলিখিত বিধি” বলে মেনে নেওয়া মানে হলো রাষ্ট্র এই অবস্থাটাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করছে। এই স্বাভাবিক করে নেওয়ার মধ্যেই সমস্যার গোড়া।
রাস্তা বানানো হয় সরকারি টাকায়, মানে জনগণের করের টাকায়। সেই রাস্তায় ব্যবসা করতে হলে আবার আলাদা করে মালিক সমিতিকে টাকা দিতে হবে, শ্রমিক সংগঠনকে টাকা দিতে হবে, আরও কত কাকে দিতে হবে তার হিসাব নেই। এই টাকা কোথায় যায়? মন্ত্রী নিজেই বললেন “কতটুকু ব্যবহার হয় সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে।” এই “হয়তো বিতর্ক” কথাটা বলার সময় তার একটুও লজ্জা লাগেনি?
পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বাংলাদেশে নতুন কিছু না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সরকার এটাকে এতটা খোলামেলাভাবে বৈধতা দেয়নি। অন্তত মুখে বলেছে এটা অন্যায়, বন্ধ করতে হবে। আজকের মন্ত্রী বললেন এটা আসলে সমঝোতা, আমরা দেখব কেউ বঞ্চিত হচ্ছে কি না। অর্থাৎ চাঁদা নেওয়া চলবে, শুধু দেখতে হবে ভাগ ঠিকমতো হচ্ছে কি না।
শব্দ বদলানো একটা পুরনো কৌশল। যখন কোনো কাজকে সরাসরি সমর্থন করা যায় না, তখন তার নাম পাল্টে দেওয়া হয়। ঘুষ হয়ে যায় উপহার, দখল হয়ে যায় উন্নয়ন, আর চাঁদা হয়ে যায় সমঝোতা। কিন্তু একজন ট্রাকচালক যিনি সকালে বেরিয়ে তিনটা জায়গায় টাকা দিয়ে তারপর মালামাল পৌঁছান, তিনি ঠিকই জানেন এটার নাম কী। তার কাছে সংজ্ঞার ফাঁকিটা ধরা পড়ে। কারণ টাকাটা তার পকেট থেকেই যায়।

