গত সতেরো মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চিকেন নেক নিয়ে যে হৈচৈ হলো, তার একটা শব্দও কি আর শোনা যাচ্ছে এখন? কোথায় গেলেন সেই সব বীরপুরুষেরা যারা টকশোর টেবিলে বসে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন? কোথায় সেই জেনারেলরা যারা ম্যাপ দেখিয়ে দেখিয়ে বোঝাচ্ছিলেন কীভাবে শিলিগুড়ি করিডর বন্ধ করে দেওয়া যাবে? সব চুপচাপ। কারণটা সোজা, ওটা ছিল শুধুই হাওয়াবাজি। আর হাওয়াবাজির একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষ হলে সবাই নিজের গর্তে ঢুকে যায়।
এদিকে ভারত কী করলো? তারা চুপচাপ নিজেদের কাজ করে গেছে। অসমের ধুবরিতে তৈরি হয়েছে লাচিত বরফুকান মিলিটারি স্টেশন, যা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া আর কিশানগঞ্জে গড়ে উঠেছে নতুন সেনা ঘাঁটি। আর আজকে মোদী গিয়ে উদ্বোধন করলেন ডিব্রুগড়ের মোরান বাইপাসে তৈরি দেশের প্রথম ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি। চার লেনের জাতীয় সড়ক, যেখানে দরকার পড়লে সুখোই কিংবা রাফায়েল নামবে আর উড়বে। এটা কোনো প্রদর্শনী না, এটা হলো আসল যুদ্ধ প্রস্তুতি। এটা হলো কৌশলগত চিন্তাভাবনা। এটা হলো সত্যিকারের জাতীয় নিরাপত্তার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের তথাকথিত বিশ্লেষকদের বোঝা দরকার, রাস্তা থেকে যুদ্ধবিমান ওঠানো কোনো সস্তা কাজ না। পুরো পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটা দেশ এই সক্ষমতা রাখে। সুইডেন, পোল্যান্ড, আর এখন ভারত। এর মানে হলো তাদের বিমানবাহিনী এয়ারবেস ছাড়াই অপারেশন চালাতে পারবে। তাদের যুদ্ধবিমানগুলো শত্রুর প্রথম আঘাতে ধ্বংস হবে না, বরং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে পাল্টা আঘাত হানতে পারবে। এটা যুদ্ধ কৌশলের একটা উচ্চতর স্তর, যা বাংলাদেশের রিটায়ার্ড জেনারেলদের টকশো থেকে বোঝা সম্ভব না।
শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে ভারতের কতটা উদ্বেগ আছে, সেটা এই পদক্ষেপগুলো দেখলেই বোঝা যায়। মাত্র বিশ কিলোমিটার চওড়া এই করিডর ভারতের পুরো পূর্বাঞ্চলকে বাকি দেশের সাথে যুক্ত করে রেখেছে। নেপাল আর বাংলাদেশের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডটা যদি কখনো কাটা পড়ে যায়, তাহলে আসাম, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা আর মেঘালয়, এই সাতটা রাজ্য মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই ভারত এই এলাকাটাকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করতে যা যা করা দরকার, সব করছে। আর এটা তারা করছে চুপচাপ, পরিকল্পনা মাফিক।
এবার আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটলো, সেটা কোনো গণআন্দোলন ছিল না। সেটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিদেশি টাকায় পরিচালিত, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো। এটাকে যতই ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, সত্যটা হলো এটা ছিল একটা সামরিক অভ্যুত্থান যেখানে জনতাকে ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউনুস সাহেব ক্ষমতায় বসলেন সুদের ব্যবসা থেকে। গ্রামের দরিদ্র মানুষের গলায় সুদের ফাঁস লাগিয়ে যিনি নোবেল পেয়েছেন, তিনিই এখন দেশ চালাচ্ছেন। সাথে এসেছে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত, যাদের হাত রক্তে রাঙানো। আর বিএনপি, যে দলটা জন্মেছিল সেনানিবাসে, যে দলের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং একজন সামরিক স্বৈরশাসক ছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন সংবিধান লঙ্ঘন করে, আর তার তৈরি দলটাও চলছে সেই একই পথে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আর ক্ষমতার অপব্যবহার, এগুলো বিএনপির রক্তে মিশে আছে।
আর এই যে পুরো নাটকটা সাজানো হলো, তার একটা বড় অংশ ছিল চিকেন নেক ইস্যুকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা। ভারতকে শত্রু বানানো, জনমতকে বিভ্রান্ত করা, আর নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে প্রতিবেশীকে দোষারোপ করা। এটা খুবই পুরনো একটা কৌশল। যখন ঘরে সমস্যা থাকে, তখন বাইরের শত্রু তৈরি করো, মানুষ ভুলে যাবে ঘরের সমস্যা। আর ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছে। রিটায়ার্ড জেনারেলদের টকশোতে বসিয়ে দেওয়া হলো। তারা ম্যাপ নিয়ে এলেন, মার্কার দিয়ে দাগ দিলেন, আর বোঝালেন কীভাবে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার ফেইক আইডি খুলে পাকিস্তানি বট আর বাংলাদেশি জামায়াত-বিএনপির সাইবার সেলের লোকজন মিলে একটা কৃত্রিম যুদ্ধোন্মাদনা তৈরি করলো। মানুষ ভাবতে লাগলো সত্যিই বুঝি যুদ্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু কী হলো শেষমেশ? কিছুই না। হঠাৎ করে সব থেমে গেল। চিকেন নেক নিয়ে সেই হুঙ্কার আর শোনা গেল না। যারা যুদ্ধের ডঙ্কা বাজাচ্ছিলেন, তারা নিজেরাই গায়েব হয়ে গেলেন। কারণ ওটা আসলে কখনোই সিরিয়াস ছিল না। ওটা ছিল রাজনৈতিক চাল। আর যখন সেই চালের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেল, তখন ইস্যুটাও শেষ হয়ে গেল। এদিকে ভারত কিন্তু থেমে থাকেনি। তারা বুঝেছিল বাংলাদেশের এই সব হাওয়াবাজি আসলে কোনো হুমকি না। তাই তারা নিজেদের কাজ করে গেছে। সামরিক স্থাপনা তৈরি করেছে, অবকাঠামো শক্তিশালী করেছে, আর আজকে রাস্তা থেকে যুদ্ধবিমান ওঠানোর ব্যবস্থা করলো।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের এই তথাকথিত মিলিটারি এক্সপার্টরা কি এগুলো দেখছেন? তারা কি বুঝতে পারছেন ভারত আসলে কী করছে? নাকি তারা এখনো মনে করছেন টকশোতে বসে বীরত্ব দেখালেই দেশ রক্ষা হয়ে যাবে? ভারতের এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি না। আর এই নিরাপত্তা জোরদার করার অর্থ হলো বাংলাদেশ সীমান্তে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো। ধুবরির মিলিটারি স্টেশন থেকে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম বা নীলফামারী কতটা দূরে? খুব বেশি না। চোপড়া আর কিশানগঞ্জ থেকে দিনাজপুর বা ঠাকুরগাঁও কতটা দূরে? কয়েক কিলোমিটার মাত্র।
আর ডিব্রুগড়ের এই ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি তো আরো বড় ব্যাপার। এটা কোনো সাধারণ রাস্তা না। এটা চার লেনের মহাসড়ক, যা বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ভারী যুদ্ধবিমানের ল্যান্ডিং আর টেকঅফ সামলাতে পারে। রাস্তার ওপরের স্তরটা তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যাতে জেট ইঞ্জিনের তাপ সহ্য করতে পারে। পাশে তৈরি করা হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ আর অস্ত্র লোডিংয়ের ব্যবস্থা। মানে একটা পূর্ণাঙ্গ এয়ারবেস না হলেও প্রায় সেই রকম সুবিধা। এখন যুদ্ধের সময় যদি ভারতের মূল এয়ারবেসগুলো আক্রান্ত হয়, তাহলে তাদের বিমানগুলো এই রাস্তাগুলো ব্যবহার করে অপারেশন চালিয়ে যেতে পারবে। এটা একটা জায়ান্ট স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ।
বাংলাদেশের কাছে এই ধরনের কোনো সক্ষমতা আছে? নেই। আর থাকবেও না, কারণ যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তাদের এদিকে কোনো মনোযোগই নেই। তারা ব্যস্ত নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে, বিরোধীদের দমন করতে, আর নিজেদের পকেট ভরতে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি যে নির্বাচন করলো, সেটা নির্বাচন বলা হাস্যকর। ওটা ছিল একটা সাজানো নাটক, যেখানে একটা পক্ষই শুধু ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, স্বচ্ছতা ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। এটাকে যতই নির্বাচন বলে চালানো হোক, সত্যিটা হলো এটা একটা প্রহসন, একটা ক্ষমতা দখলের বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র।
এখন প্রতিবেশী দেশ যখন তার সামরিক সক্ষমতা এতটা বাড়াচ্ছে, যখন তারা আসল প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই অবৈধ সরকার কী করছে? তারা কি দেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে ভাবছে? তারা কি সত্যিকারের সামরিক পরিকল্পনা করছে? নাকি তারা শুধু টকশোর ব্যবস্থা করছে যাতে রিটায়ার্ড জেনারেলরা গিয়ে বসে ম্যাপ দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানাতে পারে? বাস্তবতা হলো, এই সরকারের কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ক্ষমতায় টিকে থাকা। আর সেই কাজে তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, এমনকি দেশের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে হলেও।
ভারত যখন চিকেন নেক এলাকাটাকে সামরিকভাবে এতটা শক্তিশালী করছে, তখন বাংলাদেশের উচিত ছিল নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ভাবা। উচিত ছিল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো। উচিত ছিল প্রতিবেশীর সাথে সংলাপে বসা। কিন্তু কী হলো? হলো ঠিক উল্টো। বাংলাদেশের তথাকথিত নেতারা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেললো, ভারতকে শত্রু বানানোর চেষ্টা করলো, আর শেষমেশ যখন দেখলো যে এই সব হাওয়াবাজিতে কোনো লাভ নেই, তখন চুপ মেরে গেল। এর ফলাফল কী হলো? হলো এই যে ভারত আরো বেশি সতর্ক হলো, আরো বেশি প্রস্তুতি নিলো। আর বাংলাদেশ থাকলো সেই একই জায়গায়, শুধু মুখে বড় বড় কথা বলার ক্ষমতা নিয়ে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, যুদ্ধ জেতা শুরু হয় প্রস্তুতি দিয়ে, হাওয়াবাজি দিয়ে না। ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর বাংলাদেশ হাওয়াবাজি করছে। এই পার্থক্যটাই ঠিক করে দেবে আগামীতে কোন দেশ কোথায় দাঁড়াবে। ভারত তার শিলিগুড়ি করিডর রক্ষা করবে যেকোনো মূল্যে, এটা তাদের কাছে জীবন-মরণের প্রশ্ন। আর বাংলাদেশের তথাকথিত সামরিক বিশেষজ্ঞরা থাকবেন টিভির পর্দায়, পরের বার হয়তো কোনো নতুন ইস্যু নিয়ে একই ধরনের হৈচৈ করবেন, একই ধরনের মিথ্যা আশা জাগাবেন মানুষের মনে। আর প্রতিবেশী দেশ চুপচাপ নিজের কাজ করে যাবে। এটাই বাস্তবতা। এটাই পার্থক্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আর রাজনৈতিক হাওয়াবাজির মধ্যে।

