সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গুরুতর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ৭০টি আসনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ আসনে গুরুতর অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। টিআইবি স্পষ্ট করেছে, এটি মোট ৩০০ আসনের ৪০ শতাংশ নয়, বরং পর্যবেক্ষণ করা ৭০ আসনের মধ্যকার হিসাব।
নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)–এর নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। টিআইবি জানায়, এমন কিছু নামসর্বস্ব ও দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, যাদের কেউ কেউ এর আগে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। বিপরীতে একাধিক অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিন কাজ করা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেও নিবন্ধন পায়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুইজন উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, যা স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশন বহনের সিদ্ধান্তকে টিআইবি ‘কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামায় আয়-সম্পদ, সম্পদের বৈধতা ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত গুরুতর অসঙ্গতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও টিআইবি বিশ্লেষণে উঠে এলেও নির্বাচন কমিশন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নির্বাচনের দিন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তার ও সহিংস অনিয়ম ছিল চোখে পড়ার মতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কেন্দ্র দখল ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট কারচুপি করা হয়েছে। অন্তত ৩০টি আসনে পুনরায় ভোট গণনার দাবি জানানো হয়।
নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের তথ্য তুলে ধরে টিআইবি জানায়, ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থ বিতরণ ও হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
টিআইবি জানায়, পর্যবেক্ষণ করা ৭০টি আসনের মধ্যে— ৪৬.৪% আসনে ভোটারদের হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে তাড়ানো বা কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ। ৩৫.৭% আসনে ভোটারদের নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা। ২১.৪% আসনে জাল ভোট প্রদান ১৪.৩% আসনে বুথ দখল। ১৪.৩% আসনে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া। ১৪.৩% আসনে ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারা। ১০.৩% আসনে রিটার্নিং অফিসারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ। ৭.১% আসনে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে কাজ করতে বাধা। ৭.১% আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টিআইবি জানায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা এবং নির্বাচনি পরিবেশ তৈরিতে তাদের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনের ঠিক আগে নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দেওয়াকে পদত্যাগ করা এক উপদেষ্টার সংশ্লিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাত হিসেবে বিতর্কিত বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সরকারি গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবি জানায়, বিটিভিতে নির্বাচনি প্রচারণায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–র জন্য ব্যয়িত সময় ছিল সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৫৯.৩২ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ৩ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া প্রার্থীরা গড়ে নির্ধারিত ব্যয় সীমার চেয়ে ১৬৯.৫ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলেছে, “শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা পুরনো রাজনৈতিক চর্চায় ফিরে গেছেন।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর ফলে নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

