সম্প্রতি শেষ হলো ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এতে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি। তবে এ নির্বাচন নিয়ে ফল প্রকাশের পর দেশের অন্যতম দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্যের সুর পাল্টেছে। দুই দল প্রথমে ভোটকে সুষ্ঠু বললেও পরে এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ তুলেছে। এখন একের পর এক বেরিয়ে আসছে অনিয়মের খবর।
বিরোধী দল ও ইউনূস গংয়েরা বাংলাদেশের শেখ হাসিনার আমলে হওয়া ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪০ শতাংশ, ২০১৮ সালে এটি ছিল ৮০ শতাংশের বেশি আর পরে ভোটের হার ছিল ৪২ শতাংশ। ওই সব ভোটেই মানুষজন কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পেরেছে। আর বিএনপি এরমধ্যে দুই নির্বাচনে ভোট বর্জন করেছিল।
আর এবার নির্বাচনে জাল ভোট, অনিয়ম, ভোটের সংখ্যা গড়মিল, ভোট কেনা-বেচার খবর ছিল চোখের পড়ার মতো।
নওগাঁ-০১ আসন, কেন্দ্র নং ৪৫। মোট ভোটার: ২,৫৭৮; ভোট পড়েছে: ৩,২৮৪ হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। ভোটারের চেয়েও ৭০৬টি বেশি ভোট। এটা কোনো ভুল হিসাব নয়। এটা সরাসরি প্রমাণ যে এই নির্বাচন একটি সাজানো প্রহসন। যেখানে মানুষ ভোট দিতে যায়নি, সেখানে কাগজে-কলমে ভোট ঢেলে দেওয়া হয়েছে।
ভোটারবিহীন কেন্দ্রেই এই তথাকথিত নির্বাচনের আসল চেহারা ধরা পড়েছে। নির্বাচনকে বৈধ দেখাতেই মুহাম্মদ ইউনূস তার সেট করা নির্বাচনে কোথাও ব্যালট ভোটারের চেয়ে বেশি, আবার কোথাও ভোটের হার মোট ভোটার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভোট দিতে যায়নি দেশের অধিকাংশ মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটার হার ছিল খুবই কম। বিশেষ করে গোপালগঞ্জে মানুষ ভোট বর্জন করেছে। ঢাকার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে অলস সময় পাড় করেছেন কর্মকর্তারা। দেশের একটি কেন্দ্রে বিজিবি সদস্যদের ক্রিকেট খেলার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন যে, “এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ছিল”। তবে বিবিসি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা, পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলা করে জখম করা, নারীদের হেনস্তা করার চেষ্টা হয়েছে এবং বেশ কিছু জায়গায় কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টাও চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, “যখন একটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের বাইরে থাকে তখন সেই ভোটের নৈতিক বৈধতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। বিজিবি সদস্যদের ক্রিকেট খেলা বা ফাঁকা কেন্দ্রে কর্মকর্তাদের ঝিমুনি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টার ‘শান্তিপূর্ণ’ তকমাটি মূলত ভোটারহীনতার একটি নামান্তর মাত্র।
গণভোটের নামে প্রতারণা
দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৭ কোটি ৭৬ লাখের বেশি মানুষ এবারের গণভোটে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন (মোট ভোটারের ৩৭.৭৫ শতাংশ) এবং বিপক্ষে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন (১৭.২৮ শতাংশ)। প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন এবং ৭৪ লাখের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে।
গণভোটের ফলাফলের সবচেয়ে বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠেছে নেত্রকোনা-৩ আসনে। তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,২০,৬৮৬ জন। অথচ নির্বাচন কমিশনের উপ-সচিব মো. শাহ আলম স্বাক্ষরিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটই পড়েছে ৫,০২,৪৩৮টি। অর্থাৎ মোট ভোটারের চেয়েও ৮১ হাজার বেশি মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন! এর সাথে ‘না’ ভোটের সংখ্যা ১,৩৬,০০৫টি যোগ করলে মোট কাস্ট হওয়া ভোট দাঁড়ায় ৬,৩৮,৪৪৩টি, যা নিবন্ধিত ভোটারের তুলনায় ২ লক্ষ ১৮ হাজারের বেশি।
একই চিত্র দেখা গেছে রাজশাহী-৪ আসনেও। সেখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯ জন হলেও ভোট পড়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩টি। অর্থাৎ কাস্ট হওয়া ভোটের হার অবিশ্বাস্য ২৪৪.২৯ শতাংশ! সিরাজগঞ্জসহ আরও বেশ কিছু আসনে একই ধরনের পরিসংখ্যানগত অসংগতির খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেখানে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৫ কোটি ১৬০ ভোটার ভোট দিতে যাননি সেখানে এই ভোটকে পুরো বাংলাদেশের মানুষের ‘সম্মতি’ বলার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই। গণভোটের এই পরিসংখ্যান দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর কালো ছায়া ফেলছে বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

