বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সুষ্ঠুতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন আর রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন–পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এই তথ্যগুলো একত্রে দেখলে স্পষ্ট হয়—ভোট শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল না, বহু জায়গায় তা কার্যত নিয়ন্ত্রিত এক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ৪৬.৪ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশেই বাধা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুইটি কেন্দ্রের একটিতে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ শুরুতেই সংকুচিত হয়ে যায়। এর পাশাপাশি ২১.৪ শতাংশ কেন্দ্রে জাল ভোট পড়ার অভিযোগ উঠে এসেছে, যা ভোটার উপস্থিতির প্রকৃত চিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু তাই নয়, বহু ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই ব্যালটে সিল মারা হয়েছে—এমন অভিযোগের হার ১৪.৩ শতাংশ।
এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরাসরি চাপ ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ৩৫.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। আবার ১৪.৩ শতাংশ কেন্দ্রে বুথ দখল এবং একই হারে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে বহু এলাকায় ভোটের লড়াই কার্যত একপাক্ষিক হয়ে পড়েছে।
নির্বাচনের সুষ্ঠুতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এই পরিসংখ্যানে প্রশ্নের মুখে। টিআইবি জানাচ্ছে, ২১.৪ শতাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রতিরোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় ছিল। এছাড়া ১০.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহযোগিতা এবং একই হারে রিটার্নিং অফিসারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অনিয়ম শুধু ঘটেনি, বহু জায়গায় তা প্রতিহতও করা হয়নি।
নির্বাচনী স্বচ্ছতার আরেকটি বড় দিক—তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ সংগ্রহ—সেখানেও বাধার ছবি স্পষ্ট। টিআইবির হিসাবে, ৭.১ শতাংশ ক্ষেত্রে ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে, এবং একই হারে ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়েছে। ফলে মাঠের বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে পৌঁছানোর পথও সীমিত হয়ে পড়ে।
ভোট গণনার পরেও অস্থিরতা থামেনি। ৭.১ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে, আর নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে ১২৫টি সহিংস ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, প্রক্রিয়াটি ভোটের দিনেই নয়, ফল ঘোষণার পরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।
এই সামগ্রিক অনিয়মের প্রেক্ষাপটেই আলাদা করে নজর কাড়ে পশ্চিমবঙ্গ–বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একাধিক আসনের ফলাফল, যেখানে জামায়াত-ই-ইসলামী বাংলাদেশ–এর মতো দলের উত্থান বা প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছে। যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে টিআইবির পরিসংখ্যান নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে—এই সংযোগ উপেক্ষা করা কঠিন।
সব মিলিয়ে টিআইবির ফাইন্ডিংস একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ভোটাধিকার প্রয়োগ ছিল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত, জাল ভোট ও আগাম ব্যালটের অভিযোগ ছিল নিয়মিত, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ছিল প্রশ্নের মুখে এবং তথ্যপ্রবাহ ছিল নিয়ন্ত্রিত। এই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শুধুমাত্র ফলাফলের নিরিখে বিচার করলে চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পরিসংখ্যানের নির্দয় ভাষা একটাই প্রশ্ন সামনে আনে— এটা কি সত্যিই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল, নাকি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া?

