শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভোট জালিয়াতির সব আয়োজন করেছে। এরপরেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দোরগোড়ায় এসে ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকার পাহাড় নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের রাজনৈতিক দোসররা। দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে টাকা বিলি করতে গিয়ে একদিকে যেমন যৌথ বাহিনী ও পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন দলটির নেতারা, অন্যদিকে সাধারণ জনতার ধাওয়ার মুখেও পড়তে হচ্ছে প্রার্থীদের।
আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে আটক করা হয়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে। তল্লাশিকালে তার কাছে থাকা দুটি ব্যাগ থেকে নগদ ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে সাজানো নাটক বলে দাবি করা হলেও বিমানবন্দরের মতো কঠোর নিরাপত্তা এলাকায় এত নগদ অর্থসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার বিষয়টি জনমনে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি করেছে।
অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে শরীয়তপুরের নড়িয়াতেও। সেখানে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা ও একটি ল্যাপটপসহ স্থানীয় এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। এদিকে কুমিল্লার মুরাদনগরে বুধবার সকালে সালিয়াকান্দি ইউনিয়নের নেয়ামতকান্দি গ্রামে টাকা বিতরণের অভিযোগে হাবিবুর রহমান হেলালী নামে এক জামায়াত নেতাকে আটক করে স্থানীয় জনতা। পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। তার কাছ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ-২ আসনের কামারখন্দে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ঝাঐল ইউনিয়নের ময়নাকান্দি গ্রামে ভোট কিনতে গিয়ে জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়েন ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের আমির মোস্তাক সরকার। টাকা বিলানোর সময় গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ধরলে তিনি পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দৌড়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে উত্তেজিত জনতা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টার প্রতিবাদে তাকে ধাওয়া করছে।
অন্য দিকে, কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষেও ভোটারদের মাঝে অর্থ বিতরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভোটারদের মাঝে তার সমর্থকদের টাকা ছড়ানোর দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার স্লিপের সঙ্গে টাকা বিতরণের সময় বিএনপির দুই নেতাকে হাতেনাতে ধরেছেন স্থানীয়রা।
এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের মাধ্যমে যে অবৈধ শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্রের নামে প্রহসন চলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে পর্যবেক্ষক নিয়োগের নামে ৫৫ হাজার ভাড়াটে কর্মী নিয়োগ দেওয়াকে দেখা হচ্ছে প্রতারণার নতুন কৌশল হিসেবে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা) নামক সংস্থাকে ১০,২৫০ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যার নির্বাহী পরিচালক একজন চিহ্নিত জামাত নেতা। এই সংস্থাটি ১২৭টি আসনে যাদের মনোনীত করেছে, তারা মূলত জামাত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী। উত্তরবঙ্গসহ জামাতের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে এদের মোতায়েন করা হয়েছে।
পাশা ছাড়াও লামিয়া মোর্শেদের সাথে যুক্ত ‘কার্ড’ নামের আরেকটি সংস্থাকে ৩,৫৬১ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মোট ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষকের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজারই জামাত-শিবির ও এনসিপি’র নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
অভিযোগ উঠেছে, এদের আসল কাজ হবে নির্বাচনের দিন মাঠে নেমে বিএনপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং ভোটের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করা। ফলাফল প্রতিকূলে গেলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে হইচই করা এবং জয়ী হলে উৎসব করা—এমন নোংরা রাজনীতির নীল নকশা সাজানো হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি ছাড়াই কমপক্ষে ১৫টি নামসর্বস্ব এনজিওকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যাদের অর্থের উৎস ও এজেন্ডা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ রয়েছে। বিদেশি শক্তির অর্থ ও বিশেষ মহলের মদদে চলা এই সরকার নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এমন হীন কাজ করতে দ্বিধা করছে না।
সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের এই বিপুল অর্থের মহড়া প্রমাণ করে যে তারা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে আস্থা না রেখে অর্থ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সচেতন নাগরিক সমাজ এই ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

