ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ একটি বাড়িতে থাকতেন রমেশ সেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে। স্থানীয় জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অসামান্য। কিন্তু সরকার পতনের মাত্র ১২ দিনের মাথায় ঢাকা থেকে বিশেষ টিম পাঠিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। স্থানীয় পুলিশকে বিশ্বাস করা হলো না, যেন তারা এই কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে না।
প্রশ্ন জাগে, কেন এই বিশেষ ব্যবস্থা? কেন স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে রাজধানী থেকে লোক পাঠাতে হলো? উত্তরটা পরিষ্কার হয়ে যায় যখন আমরা দেখি যে ব্যক্তিটিকে দিয়ে এই কাজ করানো হয়েছিল, তাকে এখনও পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এই পুরো ঘটনার পেছনে কারা ছিল, সেটাও আর গোপন নেই।
রমেশ সেনকে জেলে হত্যা করা হয়েছে। ৫৪৭ দিন পর তার পরিবার পেয়েছে তার মরদেহ। অঞ্জলি সেন দরজা খুলে দিয়েছেন, কিন্তু সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা তো তার ছিল। মির্জা ফখরুলকে তিনি ঢুকতে দিয়েছেন, কারণ একজন বিধবা স্ত্রী হিসেবে তিনি হয়তো ভেবেছেন ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
মির্জা ফখরুল রমেশ সেনের মরদেহ দেখার নাটক করতে গিয়েছেন। হাত জোড় করে গিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার লোভে এই নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ জানে সত্যি ঘটনা কী। তারা জানে রমেশ সেনকে কারা গ্রেপ্তার করিয়েছিল এবং কেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের সেই আসনটিতে রমেশ সেনের জনপ্রিয়তা ছিল অপ্রতিরোধ্য। মির্জা ফখরুল সেই আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। রমেশ সেনের উপস্থিতিতে সেই আসনে জেতা ছিল তার জন্য কল্পনাতীত। তাই রমেশ সেনকে সরানো ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজন। আর সেই প্রয়োজন পূরণ করা হয়েছে জেলের ভেতরে হত্যার মাধ্যমে।
মির্জা পরিবারের ইতিহাস কলঙ্কিত। একাত্তরে এই পরিবার দেশের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল। রাজাকারের দুই সন্তান ফখরুল আর ফয়সাল আজ রাজনীতির মাঠে সক্রিয়। জেলের ভেতরে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করিয়ে তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক যিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে তার দল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে যে সহিংসতা হয়েছিল, যে দাঙ্গা বাধানো হয়েছিল, তার পেছনে ছিল এই দলের সদস্যরা এবং তাদের মিত্ররা। নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা হয়েছিল। সেই ক্যুর সময় যেসব শক্তি কাজ করেছিল, তাদের সঙ্গে বিদেশি অর্থ, ইসলামি জঙ্গি সংগঠন এবং সামরিক বাহিনীর একটি অংশের সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মির্জা ফখরুল এখন বৃদ্ধ। তার নিজের দলেই তিনি এখন আর সম্মানের মুকুট নন, বরং একটি বোঝা। তার ভাই ফয়সাল নিজ দলের কর্মীদের দ্বারাই ঠাকুরগাঁওয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। ক্ষমতার লোভ আর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এই পরিবারকে কোথায় নিয়ে গেছে, তা এখন স্পষ্ট।
রমেশ সেনের হত্যার দায় এই মির্জা পরিবারের। এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল মির্জা ফখরুলের সরাসরি নির্দেশে। ঠাকুরগাঁওয়ের সেই আসনে রমেশ সেনকে না সরালে মির্জা ফখরুলের জেতার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তাই তাকে সরানো হয়েছে। জেলে পাঠানো হয়েছে এবং সেখানে হত্যা করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ এই সত্য জানে। তারা দেখেছে কীভাবে তাদের প্রিয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারা জানে কোন শক্তি এই কাজের পেছনে ছিল। এখন যখন মির্জা ফখরুল হাত জোড় করে রমেশ সেনের বাড়িতে গিয়ে কুমিরের অশ্রু ফেলছেন, তখন মানুষ সেই ভণ্ডামি দেখছে এবং বুঝছে।
ইতিহাস এই হত্যাকাণ্ড মনে রাখবে। রমেশ সেনের মৃত্যুর দায় থেকে মির্জা ফখরুল বা তার পরিবার কখনো মুক্তি পাবে না। তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য একজন নিরপরাধ মানুষকে জেলে হত্যা করা হয়েছে। এই অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু যে ব্যবস্থায় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে ইউনুস এবং তার সহযোগীরা, সেখানে বিচার আশা করা বোকামি।
তবে জনগণের বিচার থেকে কেউ পালাতে পারে না। মির্জা ফখরুল ও তার পরিবার ইতিমধ্যেই তার মূল্য দিতে শুরু করেছে। নিজ দলেই তাদের অবস্থান টলমল করছে। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। বাংলাদেশের মানুষ এই হত্যাকাণ্ড ভুলবে না।

