রাউজান আর মীরসরাইয়ে রাতের অন্ধকারে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে হিন্দু পরিবারগুলোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। উনিশটা বাড়ি। কিছু চুরি করা হয়নি, কিছু লুটপাট হয়নি। শুধু আগুন। শুধু মৃত্যু। এই পরিকল্পিত গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সংখ্যালঘুদের মধ্যে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া যেন তারা ভোট দিতে না যায়, যেন তারা বুঝে নেয় এই দেশ আর তাদের নয়।
মুহাম্মদ ইউনুস আর তার তথাকথিত সংস্কার সরকারের আঠারো মাসের শাসনামলে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যা দেখেছে, যা সহ্য করেছে, তার কোনো নজির আগে ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন রাজপথে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, যখন ছাত্র-জনতার নামে উগ্র জঙ্গিরা নেমেছিল, তখন থেকেই পরিকল্পনা ছিল এই দেশকে একধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার। বিদেশি অর্থায়নে চলা এই অভ্যুত্থান শুরু থেকেই লক্ষ্য রেখেছিল সংখ্যালঘুদের নির্মূল করার দিকে। ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলো যে ভূমিকা পালন করেছে, সামরিক বাহিনী যে নীরব সমর্থন দিয়েছে, সেসব এখন আর গোপন থাকার মতো বিষয় নয়।
ইউনুস সাহেব নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে সুদ খেয়ে। গ্রামীণ ব্যাংকের নামে যে সুদী মহাজনি ব্যবসা তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন, সেখানে দরিদ্র মহিলাদের কাছ থেকে যে হারে সুদ আদায় করা হতো তা ছিল ব্যাংক সুদের চেয়ে অনেক বেশি। এই মানুষটাই এখন নৈতিকতার ধ্বজাধারী সেজে দেশ চালাচ্ছেন। তার সরকারের আঠারো মাসে একটা সংখ্যালঘু পরিবারও নিরাপদে ঘুমাতে পারেনি। মন্দির ভাঙা হয়েছে, দোকান লুট হয়েছে, বাড়ি জ্বালানো হয়েছে, মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে। আর সরকার? তারা ব্যস্ত ছিল সংস্কারের নামে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম লেখা আছে। এটা নিজেই একটা প্রহসন, একটা ভণ্ডামি। কোনো দেশের রাষ্ট্রধর্ম থাকলে সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য ধর্মের মানুষদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে ফেলে। রাষ্ট্র যখন একটা ধর্মকে মেনে নেয়, তখন সেই ধর্মের বাইরের সবাই রাষ্ট্রের কাছে গৌণ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এই বাস্তবতা এখন উন্মোচিত হয়ে গেছে রক্তাক্তভাবে। ইউনুসের সরকার যে শুধু এই অবিচার মেনে নিয়েছে তা নয়, বরং তারা এটাকে উৎসাহিত করেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে।
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস যে দ্বিমুখী প্যারাডক্সের কথা বলেছেন, সেটা বুঝতে হলে সংখ্যালঘুদের অবস্থান বুঝতে হবে। তারা যদি ভোট দিতে যায়, তাহলে তাদের বলা হবে তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তারা যদি ভোট দিতে না যায়, তাহলে বলা হবে তারা নির্বাচন বয়কট করেছে, তারা দেশদ্রোহী। আর এই দুই অবস্থাতেই তাদের ওপর হামলা হবে, তাদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হবে। কারণ প্রকৃত লক্ষ্য ভোট নয়, প্রকৃত লক্ষ্য হলো তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা।
মীরসরাইয়ে যারা বাড়িতে আগুন দিয়েছে, তারা কিছু চুরি করেনি। এই তথ্যটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুরি করলে বোঝা যেত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু না, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র আতঙ্ক সৃষ্টি করা, মানুষ পুড়িয়ে মারা। এটা নিছক সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা পরিকল্পিত জাতিগত নির্মূলের চেষ্টা। আর এই ঘটনার পর সরকারের তরফ থেকে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। এটাই প্রমাণ করে যে সরকার নিজেই এই নির্মূল প্রক্রিয়ার অংশীদার।
সিটিজেনস অব হিউম্যান রাইটসের জাকির হোসেন যে পাঁচটা দাবি তুলেছেন, সেগুলো যৌক্তিক এবং ন্যায্য। কিন্তু এসব দাবি পূরণের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ যে সরকার নিজেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, যে সরকারের ভিত্তিই তৈরি হয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির ওপর নির্ভর করে, তারা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেবে কেন? তাদের রাজনৈতিক স্বার্থই হলো সংখ্যালঘুদের দমন করা, তাদের ভয় দেখানো, তাদের নিশ্চিহ্ন করা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, সবই এখন একটা মৌলবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডার অধীনে চলছে। ঘুষ, তদবির, দুর্নীতি তো আছেই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদ। যারা প্রান্তিক, যারা অসহায়, তাদের জন্য রাষ্ট্র বলে আর কিছু নেই। তারা এখন শুধু ঈশ্বরের কাছে বিচার চাইতে পারে, কারণ পৃথিবীর কোনো আদালত তাদের জন্য খোলা নেই।
ইউনুসের এই সরকার যে উদ্দেশ্যে ক্ষমতায় এসেছে, তা এখন পরিষ্কার। বাংলাদেশকে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে সংখ্যালঘুদের কোনো স্থান নেই। দেশের ভেতরে যে সামান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বাকি ছিল, সেগুলোকে ধ্বংস করা। আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অপরাধগুলোকে নীরবে মেনে নিচ্ছে। কারণ ইউনুসের আন্তর্জাতিক সংযোগ আছে, তার পশ্চিমা প্রভুরা আছে, তার নোবেল পুরস্কারের জৌলুস আছে।

