মাসুম মিয়ার দশ একর জমিতে গত বছর আলু চাষ করে লোকসান হয়েছে আঠারো লাখ টাকা। ছলিম উদ্দীনের দেড় লাখ। মাহবুব আলম চারশো বস্তা আলু হিমাগারে রেখে দিয়ে আর তুলতেই পারেননি, কারণ বাজারদর এতটাই পড়ে গেছে যে তোলার খরচও উঠবে না। রংপুরের পীরগাছা-কাউনিয়ার এই আলুচাষিরা এখন গরু বিক্রি করছেন, এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন, কেউ কেউ তো এলাকা ছেড়েই পালিয়ে গেছেন পাওনাদারদের ভয়ে। কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীরা এসব নিয়ে একটা শব্দও খরচ করছেন না। ভোট চাইতে আসেন ঠিকই, কিন্তু আলুচাষিদের এই বিপর্যয় নিয়ে কোনো কথাই বলেন না।
ছলিম উদ্দীন যেমন বলেছেন, “ওমার ভোটের দরকার। খালি ভোট চায়। আলু নিয়্যা কথা কয় না। হামার দুঃখের কথা কায় শোনে।” এই একটা বাক্যেই উঠে এসেছে পুরো চিত্রটা। রংপুর এখন দেশের সবচেয়ে বড় আলু উৎপাদনকারী জেলা, পরপর তিন বছর ধরে সবার ওপরে। এখানকার প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সংকট নিয়ে যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
মূল সমস্যাটা কী? উৎপাদন খরচ পড়ছে কেজিতে সতেরো টাকা আশি পয়সা, আর বিক্রি হচ্ছে আট টাকায়। এই হিসাবে তো লোকসান হবেই। কিন্তু লোকসান শুধু এটুকুতেই শেষ নয়। আলুবীজ, সার, কীটনাশক সব কিছুর দাম আকাশছোঁয়া। সেচ, মজুরি, হিমাগার ভাড়া সব মিলিয়ে চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পঁয়সট্টি কেজি আলুর একটা বস্তা হিমাগারে রাখতে তিনশো আশি টাকা খরচ। আর এই হিমাগারগুলোতে দালাল আর মধ্যস্বত্তভোগীদের এমন দাপট যে সাধারণ চাষিরা ঠিকমতো সেবাও পান না। রপ্তানি হয় না কারণ আলুর মান ঠিক রাখার ব্যবস্থা নেই। আলু দিয়ে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো শিল্পও গড়ে ওঠেনি এখানে।
এই পরিস্থিতিতে গত বছরের তুলনায় এ বছর এগারো হাজার সাতশো আশি হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হচ্ছে। চাষিরা ভয়ে জমি কমিয়ে দিয়েছেন। মাসুম মিয়া দশ একর থেকে নামিয়ে এনেছেন সাড়ে তিন একরে। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু নির্বাচনী প্রার্থীদের কাছে এসব যেন কোনো ইশু-ই না।
এদিকে দেশে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানে তো আরও বিপদের গন্ধ। গত বছরের জুলাই মাসে দেশজুড়ে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলো, সেটা কি সত্যিই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল? নাকি সেখানে বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের মদদ আর সামরিক বাহিনীর একটা অংশের সমর্থন ছিল? নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যেভাবে ক্ষমতা দখল হলো, তার পেছনে কারা ছিল সেটা এখন আর গোপন বিষয় নয়। মুহাম্মদ ইউনূস আর তার সহযোগীরা যেভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, সেটা কি সাংবিধানিক? তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আর বিএনপি যেভাবে মিশে গেছে, সেটা কি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনতে পারে?
জামায়াত তো যুদ্ধাপরাধীদের দল। একাত্তরে এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। আর বিএনপি? সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া এই দলটি দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের সমার্থক হয়ে গেছে বছরের পর বছরে। জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক ছিলেন, আর তার তৈরি এই দলটি গণতন্ত্রের নামে দেশকে কোথায় নিয়ে গেছে সেটা সবাই জানে। এখন এই দুই দল মিলে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টায় আছে একটা নামসর্বস্ব নির্বাচনের মাধ্যমে।
কিন্তু রংপুরের আলুচাষিদের কী হবে? তাদের লোকসান, তাদের ঋণের বোঝা, তাদের পরিবারের সংকট নিয়ে কি এই রাজনীতিবিদদের কোনো ভাবনা আছে? নির্বাচনী প্রচারে তো সবাই উন্নয়নের কথা বলবেন, ভোটের জন্য হাত জোড় করবেন, কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান কে দেবে? সরকারি হিমাগার তৈরি করা, মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম বন্ধ করা, আলুর ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, রপ্তানির ব্যবস্থা করা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প গড়ে তোলা এসব তো সরকারের কাজ। কিন্তু যারা এখন ক্ষমতায় এসেছেন অবৈধভাবে, আর যারা এই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চাইছেন, তারা কি এসব নিয়ে ভাবছেন?
সুমন কুমার শর্মা মাঠে ইউরিয়া দিচ্ছেন। তিনি জানেন লোকসান হতে পারে, কিন্তু কৃষি ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। এই যে নিরুপায় মানুষগুলো, যারা দেশের খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখছেন, তাদের ভাগ্য কি এভাবেই পড়ে থাকবে? আর রাজনীতিবিদরা শুধু ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন?
রাজনীতি যদি জনগণের সেবা করার জন্য না হয়ে শুধু ক্ষমতা দখলের খেলা হয়, তাহলে সেই রাজনীতির কোনো মূল্য নেই। জামায়াত-বিএনপির এই জোট আর অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে রংপুরের আলুচাষি থেকে শুরু করে দেশের সব সাধারণ মানুষই যেন গোল্লায় গেছে। তাদের দুর্দশা, তাদের সমস্যা, তাদের আর্তনাদ কারো কানেই পৌঁছাচ্ছে না।
ছলিম উদ্দীনের কথাটাই বারবার মনে পড়ছে। “খালি ভোট চায়, আলু নিয়্যা কথা কয় না।” এই একটা লাইনেই পুরো রাজনৈতিক বাস্তবতা ধরা পড়ে গেছে। জনগণ মানে শুধু ভোট, তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

