সাংবাদিকরা মিছিলে নেমে পড়েছেন। ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরা রেখে। কলম ফেলে হাতে তুলে নিয়েছেন দলীয় পতাকা। যাদের পেশা ছিল ঘটনা জানানো, তারা এখন নিজেরাই ঘটনা তৈরি করছেন। আর এসবের পেছনে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত নকশা, যার সুতোর টান যায় অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের হাতে।
যে সাংবাদিকরা একসময় দেশের বিবেককে প্রতিনিধিত্ব করতেন, আজ তাদের একটা অংশ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের প্রচার বিভাগ। এটা কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়। এটা দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফসল। যে প্রক্রিয়ায় একদল সাংবাদিককে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। আর এই রূপান্তরের পেছনের মূল কারিগর হলো ইউনুস এবং তার পৃষ্ঠপোষক শক্তি বিএনপি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন দেশজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল, তখন অনেক সাংবাদিক সেই আগুনে ঘি ঢালার কাজটাই করেছিলেন। নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলার যে চক্রান্ত, তার প্রতিটি স্তরে কিছু গণমাধ্যমকর্মী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি, সংবাদ তৈরি করেছেন। বাস্তবতাকে বিকৃত করে এমন এক আখ্যান তৈরি করেছেন যা জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, বিভক্ত করেছে।
এটা আর রাজনৈতিক সহানুভূতির গোপন প্রশ্রয়ের যুগ নেই। এখন প্রকাশ্য দলবাজি চলছে। যারা ক্ষমতার দুর্নীতি তুলে ধরার কথা, তারা নিজেরাই ক্ষমতার সবচেয়ে কলুষিত অংশে পরিণত হয়েছেন। আর এর পেছনে যে মূল চালিকা শক্তি, তা হলো অর্থ আর পদের লোভ। বিদেশি অর্থায়নে পুষ্ট এই অবৈধ সরকার গণমাধ্যমকে কিনে নিয়েছে, দখল করে নিয়েছে। পুরস্কার হিসেবে অফার করেছে রাষ্ট্রীয় পদ, বিদেশি নিয়োগ, উপদেষ্টার চেয়ার। যারা এই প্রলোভনে পা দিয়েছেন, তারা নিজেদের পেশাগত সততা বিকিয়ে দিয়েছেন।
স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান যে দল সেনানিবাসে জন্ম দিয়েছিলেন, সেই বিএনপি আজ দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার প্রতিটি অবৈধ পথ তাদের চেনা, প্রতিটি বক্র রাস্তায় তাদের পদচিহ্ন রয়েছে। আর এবার তারা গণমাধ্যমকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সাংবাদিকদের এক অংশকে তারা পেইড এজেন্টে রূপান্তরিত করেছে। যাদের কাজ আর সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং দলীয় প্রপাগান্ডা ছড়ানো।
ইউনুস সাহেব দেশের মানুষকে সুদের জালে আটকে রেখে মহাজনি ব্যবসায় কোটিপতি হয়েছেন। তার মাইক্রোক্রেডিট সাম্রাজ্যে দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে, আর তার ব্যাংক ব্যালান্স স্ফীত হয়েছে। সেই একই কায়দায় এখন তিনি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। সাংবাদিকদের এক অংশকে তিনি কিনে নিয়েছেন। আর যারা কেনা যায়নি, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ভয় দেখিয়ে, চাপ প্রয়োগ করে।
জুলাইয়ের সেই দাঙ্গার পেছনে ছিল বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থায়ন, ছিল ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা, ছিল সামরিক বাহিনীর একটা অংশের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। আর এই সবকিছুর সুতো টানতে গণমাধ্যমের এক অংশ ব্যবহৃত হয়েছে। নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার নামে তারা একতরফা প্রচারণা চালিয়েছে। ঘটনাকে বিকৃত করেছে, প্রেক্ষাপট গোপন করেছে, মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করেছে।
যে গণমাধ্যম ক্ষমতাকে জবাবদিহি করাবে, সেই গণমাধ্যম যখন ক্ষমতার কোলে বসে যায়, তখন গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ভেঙে পড়ে। আর এই ভাঙা স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষে যারা তামাশা দেখছে, তারা হলো ইউনুস এবং তার রাজনৈতিক সহযোগীরা। তারা জানে যে জনগণকে ঠকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা। তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে যে কোনো অবৈধ কাজকেও বৈধতার আবরণ দেওয়া যায়।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিছু সাংবাদিককে পদ-পদবির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাদের বোঝানো হয়েছে যে বর্তমান সরকার টিকে গেলে তারা বড় বড় সুবিধা পাবে। রাষ্ট্রদূতের পদ, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, কিংবা নানা প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার সুযোগ মিলবে। এই লোভ দেখিয়ে একদল সাংবাদিককে পেশাগত নীতি ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকতার মূল শক্তিই ছিল তার নিরপেক্ষতা। পক্ষপাতহীনভাবে সত্য তুলে ধরার ক্ষমতাই সাংবাদিককে সম্মানিত করে। কিন্তু যখন সাংবাদিক নিজেই একটা রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হয়ে ওঠে, তখন সে আর সাংবাদিক থাকে না, হয়ে যায় প্রচারক। আর প্রচারক কখনো সত্য বলতে পারে না, কারণ তার কাজ সত্য বলা নয়, যা বলতে বলা হয় তা বলা।
বিএনপির ইতিহাস জুড়ে আছে দুর্নীতির কালো অধ্যায়। ক্ষমতায় থাকাকালীন তারা দেশের সম্পদ লুট করেছে, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। আর এখন তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হত্যা করছে। তাদের এজেন্টরা নিউজরুমে বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোন সংবাদ ছাপা হবে, কোন সংবাদ চাপা পড়বে। কোন ঘটনায় হাইলাইট পড়বে, কোন ঘটনা অন্ধকারে থাকবে।
এই পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সাধারণ মানুষ আর সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাস করে না। তারা জানে যে তাদের সামনে যা পরিবেশন করা হচ্ছে, তা সংবাদ নয়, পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা। আর এই অবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় দায় বহন করছে সেইসব সাংবাদিক যারা নিজেদের পেশাকে বিকিয়ে দিয়েছেন। যারা নিজেদের নৈতিকতা বন্ধক রেখে ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করছেন।
ইউনুসের অবৈধ সরকার এখন চায় গণমাধ্যমকে তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। তারা চায় প্রতিটি সংবাদপত্র, প্রতিটি টিভি চ্যানেল, প্রতিটি অনলাইন পোর্টাল তাদের কথাই বলবে। বিরোধী কণ্ঠস্বর যেন উচ্চারিত না হয়, সেজন্য তারা সাংবাদিকদের কিনছে, হুমকি দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ করছে। আর যেসব সাংবাদিক এই নোংরা খেলায় অংশ নিচ্ছেন, তারা শুধু নিজেদের সম্মানই হারাচ্ছেন না, পুরো পেশার সম্মান ধূলিসাৎ করছেন।
দেশের ইতিহাসে এমন সময় এসেছে যখন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় যা ছাপা হয়, তা বিশ্বাস করার আগে মানুষ দশবার ভাবে। যখন টিভিতে যা দেখানো হয়, তা সত্য কি না তা নিয়ে সন্দেহ জাগে। এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে সাংবাদিকদের একটা অংশের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে। যারা পদ-পদবির লোভে, অর্থের লোভে নিজেদের সত্যবাদিতা বিসর্জন দিয়েছেন।
বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা দেশকে দুর্নীতিতে ডুবিয়ে দিয়েছিল। আর এখন ইউনুসের অবৈধ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা গণমাধ্যমকে দুর্নীতিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে। সাংবাদিকদের এক অংশকে তারা নিজেদের পকেটে পুরে ফেলেছে। যাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের কাজের প্রশংসা করা, বিরোধীদের কালিমালিপ্ত করা, সত্য ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া।
এই পরিস্থিতির আসল ক্ষতিটা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী। একটা প্রজন্ম বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গণমাধ্যম মানেই মিথ্যার বাহক, প্রপাগান্ডার হাতিয়ার। তারা জানে না সংবাদমাধ্যম আসলে কী হতে পারে, কী ভূমিকা পালন করতে পারে গণতন্ত্রে। তারা যা দেখছে তা হলো ক্ষমতার দালালি করা, মিথ্যা ছড়ানো, বিভ্রান্তি তৈরি করা। এই প্রজন্মকে সত্যিকারের সাংবাদিকতার মূল্য শেখানোর দায়িত্ব ছিল আজকের সাংবাদিকদের। কিন্তু তার বদলে তারা যা শেখাচ্ছে তা হলো কীভাবে নীতিহীন হতে হয়, কীভাবে বিবেক বিকিয়ে দিতে হয়।
অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো সত্য। তাই তারা সত্যকে দমন করতে চায়, সত্যের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করতে চায়। আর সেজন্য তারা যে কৌশল বেছে নিয়েছে, তা হলো সাংবাদিকদের কিনে ফেলা। যাদের কেনা যায় না, তাদের ভয় দেখানো। যারা ভয় পায় না, তাদের একঘরে করে দেওয়া। এভাবে তারা একটা পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইউনুসের মাইক্রোক্রেডিট সাম্রাজ্য যেভাবে দরিদ্রদের শোষণ করে গড়ে উঠেছে, ঠিক সেভাবে এই অবৈধ সরকার গণমাধ্যমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকদের শোষণ করছে। তাদের ক্ষমতার লোভ, অর্থের লোভকে পুঁজি করে তৈরি করছে দুর্নীতির এক নেটওয়ার্ক। যেখানে সাংবাদিক আর সাংবাদিক নেই, হয়ে গেছে রাজনৈতিক কর্মী। যেখানে নিউজরুম আর নিউজরুম নেই, হয়ে গেছে দলীয় অফিস।
এই যে সাংবাদিকরা মিছিলে নামছেন, প্রকাশ্যে দলীয় পতাকা তুলছেন, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি অর্থায়ন এসেছে, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের মদদ এসেছে, সামরিক বাহিনীর একটা অংশের প্রচ্ছন্ন সমর্থন এসেছে। আর সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে ইউনুস এবং তার পৃষ্ঠপোষক বিএনপি। যারা চায় দেশের গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে, যাতে কেউ তাদের অপকর্মের কথা তুলে ধরতে না পারে।
সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা এখন মাটিতে। যারা এই পেশাকে সম্মান করতেন, তারা এখন ঘৃণা করেন। যারা সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাস করতেন, তারা এখন সন্দেহের চোখে দেখেন। এই পতনের জন্য দায়ী শুধু ক্ষমতাধররাই নয়, দায়ী সেইসব সাংবাদিকও যারা নিজেদের পেশাগত নীতি ভুলে গিয়ে রাজনীতির দাস হয়ে গেছেন। যারা কলম ফেলে তুলে নিয়েছেন রাজনৈতিক অস্ত্র। যারা সত্য বলার সাহস হারিয়ে মিথ্যা প্রচারের সেবক হয়ে গেছেন।

