ভাড়া খাটা তথাকথিত নির্বাচন পর্যবেক্ষক এনেছে ইউনুস জানার পর মাথায় প্রথমেই এসেছে আমার যে, জাতির ঘাড়ে বন্দুকের নল চেপে ধরে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছ থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায় এর থেকে ভালো! গত বছরের জুলাই মাসে রক্তাক্ত দাঙ্গার মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যে অবৈধ শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্রের নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য এখন যে প্রহসন চলছে তা দেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। ইউনুস এবং তার তথাকথিত সরকার এখন যে নির্বাচনী খেলা সাজাচ্ছে, তাতে পর্যবেক্ষকের নামে প্রায় পঞ্চান্ন হাজার ভাড়াটে কর্মী নিয়োগ দিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রতারণায়।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী এই বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগের পেছনে যে চক্রান্ত লুকিয়ে আছে, তা এতটাই স্পষ্ট যে চোখ বন্ধ করে থাকলেও দেখা যায়। নির্বাচন কমিশন এবং জেলা উপজেলা পর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র উঠে আসে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট নামের যে সংস্থাটিকে দশ হাজার দুইশ পঞ্চাশ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীর একজন চিহ্নিত জামাত নেতা। শুধু তিনি নন, তার পুরো পরিবারই জামাতের সক্রিয় সমর্থক। এই সংস্থা একশ সাতাশটি আসনে যাদের মনোনীত করেছে, তাদের প্রায় সবাই জামাত-শিবিরের কর্মী।
এদের নিয়োগের ধরন দেখলেই বোঝা যায় কোন আসনগুলো তাদের টার্গেট। লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ সব মিলিয়ে যেসব আসনে এদের মোতায়েন করা হয়েছে, সেগুলো মূলত সেই এলাকা যেখানে জামাতের ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। এটা কাকতালীয় নয়, এটা সুপরিকল্পিত কৌশল।
শুধু পাশা নয়, ইউনুসের ঘনিষ্ঠ লামিয়া মোর্শেদের সাথে যুক্ত কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট নামের আরেকটি সংস্থা পেয়েছে তিন হাজার পাঁচশ একষট্টি জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন। এখানেও একই খেলা। পর্যবেক্ষকের আড়ালে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জামাত-শিবির এবং এনসিপির কর্মীদের। ধারণা করা হচ্ছে পঞ্চান্ন হাজার পর্যবেক্ষকের মধ্যে অন্তত চল্লিশ হাজারই হচ্ছে এই তিন দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
এতগুলো মানুষকে পর্যবেক্ষক বানানোর উদ্দেশ্য কী? নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা? না, তাদের আসল কাজ হবে নির্বাচনের দিন মাঠে নেমে বিএনপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। ফলাফল যদি জামাতের প্রতিকূলে যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হৈচৈ ফেলে দেওয়া যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, কারচুপি হয়েছে। আর যদি জামাত জয়ী হয়, তখন ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা যে দেখুন কী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। এমন নোংরা রাজনীতি আর ভণ্ডামি এদেশের মানুষ কখনো দেখেনি।
পাশা এবং কার্ডের মতো কমপক্ষে পনেরোটি নামসর্বস্ব এনজিওকে গত ডিসেম্বরে পর্যবেক্ষক হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সংস্থাগুলোর কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই, কোনো সুনাম নেই, কোনো স্বচ্ছতা নেই। শুধু কাগজে কলমে একটা নাম আর ঠিকানা। কিন্তু হঠাৎ করে এদের হাতে তুলে দেওয়া হলো হাজার হাজার পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা। এসব সংস্থার পেছনে কারা আছে, কাদের টাকায় চলছে, কী তাদের এজেন্ডা, এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না। কিন্তু উত্তর জানা আছে সবার। বিদেশি শক্তির অর্থ, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা আর সামরিক বাহিনীর মদদে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার তাদের প্রভুদের খুশি করতে এবং নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এই ধরনের হীন কাজ করতে দ্বিধা করবে না, এটাই স্বাভাবিক।
গত বছরের জুলাইয়ে সারাদেশে যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধানো হয়েছিল, তার পেছনে যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল, তা এখন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। একটি নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে ক্যু করে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় এসে এখন নির্বাচনের নামে যে তামাশা চলছে, তা দিয়ে আসলে কাদের লাভ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুদী মহাজন হিসেবে খ্যাত ইউনুস যে ক্ষমতায় থেকে দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা এখন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে।
নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগের এই কেলেঙ্কারি আসলে একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ মাত্র। যারা মনে করেছিল জনগণকে বোকা বানিয়ে গণতন্ত্রের নাটক করে নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়া যাবে, তারা ভুল করেছে। দেশের মানুষ সব দেখছে, সব বুঝছে। যে সরকারের জন্ম হয়েছে রক্তের উপর দিয়ে, ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে, সেই সরকার যতই নির্বাচনের প্রহসন মঞ্চস্থ করুক না কেন, তাদের বৈধতা কখনো আসবে না।

