বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে, তা একটা দেশের পতনের সর্বশেষ ধাপ। একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যখন কেউ ক্ষমতায় বসে, তখন তার বৈধতা থাকে না। ইউনুস আর তার দলবল ঠিক এই কাজটাই করেছে। ‘২৪ এর জুলাই মাসে যে দাঙ্গা হলো, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। পরিকল্পিত একটা ষড়যন্ত্র ছিল, যার পেছনে বিদেশি টাকা, জঙ্গি সংগঠনের মদদ আর সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল।
এখন ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেটা আসলে নির্বাচনের নামে একটা প্রহসন। গণতন্ত্রের নামে যা হচ্ছে, তা আসলে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার একটা চালাকি মাত্র। আনসার আর ভিডিপির মাধ্যমে যে খেলাটা সাজানো হচ্ছে, সেটা দেখলে বোঝা যায় এই নির্বাচনে জনগণের ভোটের কোনো মূল্য থাকবে না।
মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ যে পরিকল্পনা করেছেন, তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। তিন হাজারের বেশি জামাত-শিবির আর হিযবুত তাহরীরের সদস্যকে আনসারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরা যারা একসময় দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, তাদেরকে এখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে জায়গা দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে আরও তিন হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ লাখের বেশি আনসার-ভিডিপি সদস্য নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে থাকবে, ব্যালট বাক্স পাহারা দেবে।
এভিএমআইএস নামের যে সফটওয়্যারের কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে ভোট কারচুপির একটা হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে হেডকোয়ার্টার থেকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া যাবে মাঠে থাকা আনসার সদস্যদের। ভোটকেন্দ্রে যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবে, ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়া যাবে। ব্রেকফাস্ট আর মুভ ফাস্ট নামের কোড দিয়ে নাকি সিলমারার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব শুনলে মনে হয় কোনো গুপ্তচর সিনেমার গল্প, কিন্তু এটা বাস্তব।
আনসার-ভিডিপি সদস্যদের পরিবারের সবাইকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, প্রত্যেককে পাঁচটা করে ভোট নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। না হলে চাকরি যাবে। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র? এটা তো সরাসরি জবরদস্তি। একটা মানুষ যখন ভয়ে, চাপে ভোট দেয়, সেটা আর স্বাধীন ভোট থাকে না।
তুরস্ক থেকে ত্রিশ হাজারের বেশি সেমি অটোমেটিক শটগান কিনে আনসার সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের সময় এই অস্ত্র নিয়ে যারা মাঠে থাকবে, তারা কি করবে? জনগণকে ভয় দেখানো? প্রতিবাদ দমন করা? একটা নির্বাচনে এত অস্ত্রের দরকার কেন? এসব প্রশ্নের জবাব কেউ দিচ্ছে না।
এই পুরো ব্যবস্থার মূল কারিগর হচ্ছেন আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, যিনি নিজেই ছাত্রজীবনে শিবিরের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই তিনজন জামাতপন্থী সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আর স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি এই কাজে সাহায্য করেছেন। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র এখন একটা বিশেষ মতাদর্শের হাতে বন্দি।
সচিবালয়ে আনসার সদস্যদের ওপর যে হামলা হয়েছিল ‘২৪ এর আগস্ট মাসে, সেটার পর তাদেরকে আওয়ামী লীগের লেবেল দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। যারা ইউনিফর্ম পরে দেশের সেবা করছিল, তাদেরকে রাজনৈতিক কারণে বের করে দেওয়া হলো। কিন্তু জামাত-শিবিরের লোকদের জায়গা দেওয়া হলো। এটা কোন ধরনের ন্যায়বিচার?
জামাত-শিবির যে কোনো কিছু করতে পারে নিজেদের স্বার্থে, এটা আর নতুন কথা নয়। এদের ইতিহাস রক্তে ভেজা। একাত্তরে যারা এই দেশের মানুষ মেরেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, সেই একই শক্তি আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ইউনুস আর তার দলবল এদেরকে ক্ষমতায় আনার জন্য পুরো একটা দেশকে জিম্মি করে রেখেছে।
এখন যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা নির্বাচন নয়, একটা সাজানো নাটক। জনগণের মতামতের কোনো মূল্য থাকবে না। আনসার-ভিডিপির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সফটওয়্যারের মাধ্যমে কারচুপি হবে, অস্ত্রের মুখে মানুষকে ভয় দেখানো হবে। এর নাম গণতন্ত্র নয়, একনায়কতন্ত্র।
বাংলাদেশের মানুষ একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাদের ভোটের অধিকার আছে, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এখন সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশটা এগিয়ে যাওয়ার বদলে পেছনের দিকে হাঁটছে। যে স্বপ্ন নিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা আজ পদদলিত হচ্ছে।
ইউনুস আর তার সহযোগীরা মনে করছে টাকা আর অস্ত্র দিয়ে সব কিছু করা যায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, জনগণকে চিরকাল দমিয়ে রাখা যায় না। আজ হোক কাল হোক, সত্য বেরিয়ে আসবে। যারা দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।জামাত-শিবির আর তাদের মদদদাতারা যত বড় ষড়যন্ত্রই করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত গণমানুষের শক্তিই জিতবে।

