ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৭ মাসে বাংলাদেশে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই সময়ে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বর্তমানে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটি ১৫টি জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য। সংস্থাটি জানায়, সামান্য সন্দেহ বা তুচ্ছ অজুহাতে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া রাজধানীতে চোর সন্দেহে একজনকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশে লবণ ঢেলে উল্লাস করার মতো ঘটনা সমাজমানসের চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ৪১১টি ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে বিএনপির অভ্যন্তরে। বিএনপির নিজস্ব অন্তর্কোন্দলেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২১ জন। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত তিন মাসেই (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ১৫৫টি সহিংস ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মব জাস্টিসের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও বন্দুকযুদ্ধের অভিযোগও বাড়ছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে বা হেফাজতে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২২ জন নির্যাতনে এবং ১২ জন হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। এছাড়া কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১২৭ জন কয়েদি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এই সময়ে ৬ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন এবং হামলার শিকার হয়েছেন ৮৩৪ জন। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সুরক্ষা অধ্যাদেশের অধীনে ভিন্নমত দমনে ৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও সংকটের মুখে পড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ১৭টি মন্দির ও ৬৫টি বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রও ভয়ংকর; গত ১৭ মাসে ২৬১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে মব ভায়োলেন্স এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সংলাপ এখন সময়ের দাবি।

