শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হলেও উপদেষ্টা পরিষদ তাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ না করে জনগণকে এক প্রকার প্রতারিত করেছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকালে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সম্পদের হিসাব প্রকাশের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন শাহজাদা এম আকরাম এবং মো. জুলকারনাইন। প্রতিবেদনে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন এবং রাষ্ট্র পরিচালনের নিরিখে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সার্বিক পর্যবেক্ষণে বিচার ও নির্বাচনের অবকাঠামো তৈরিতে কিছু অগ্রগতি হলেও তা পর্যাপ্ত শক্তিশালী ও মজবুত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে যতটুকু মজবুত ভিত্তি প্রয়োজন ছিল, ততটুকু হয়নি; যার ফলে ভবিষ্যতেও এই ভিত্তিটি আরও দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। তার মতে, সরকার সংস্কারকে কেবল তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পথে যে ঝুঁকিগুলো ছিল তা নিরসনের কার্যকর উপায় অনুসন্ধান করেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে ‘জুলাই সনদ’ দুর্বল হয়েছে এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের প্রতি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা দেখা গেছে। বিশেষ করে জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত গণভোট নিয়ে দেশজুড়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছে। বিচার বিভাগের সংস্কারে কিছু সাফল্য এলেও টিআইবি মনে করে, বর্তমানে বিচার এবং প্রতিশোধের মধ্যে একধরনের একাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে। বাস্তবে বিচার কতটুকু আর প্রতিশোধ কতটুকু, সেই বিতর্কটি থেকেই যাচ্ছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মের অপব্যবহারের প্রকট দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। এর ফলে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করে কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অপসারণের মাধ্যমে দলীয়করণ মুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও ফল হয়েছে উল্টো। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগের একচেটিয়া প্রভাব থেকে বেরিয়ে প্রশাসন এখন ত্রিমুখী প্রভাবের কবলে পড়েছে।
দেশের আর্থিক খাতের চিত্র বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম এবং অসংলগ্ন ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন বেপরোয়াভাবে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাত ‘স্বাভাবিক’ রয়েছে বলে প্রচার করা হলেও পর্দার আড়ালে ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের টাকা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টিআইবির এই প্রতিবেদনটি ইউনূস সরকারের স্বচ্ছতা ও সক্ষমতার ওপর এক বড় চপেটাঘাত।সংস্কারের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ দেড় বছর পার করলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ও লুটপাট বাড়তে থাকা এবং ব্যাংক খাত থেকে গোপনীয়ভাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়া রাষ্ট্রকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের আর্থিক ভিত্তি ধসে পড়ার পাশাপাশি জনরোষ তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

