জেফরি এপস্টেইনের নাম শুনলেই সারা পৃথিবীর মানুষ এখন শিউরে ওঠে। যৌন নিপীড়ন, শিশু পাচার আর ক্ষমতাবানদের সঙ্গে কুটিল বন্ধুত্বের এক কলঙ্কময় ইতিহাস এই মানুষটির। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে এবার সেই এপস্টেইন ফাইলে উঠে এসেছে একটি বাংলাদেশি নাম। বিএনপি নেতা আব্দুল আওয়াল মিন্টু, যিনি ফেনী-৩ আসনের মনোনীত প্রার্থী এবং ব্যবসায়ী পরিচয়ে পরিচিত, তিনি ২০০৬ সালে সাবেক নিউ মেক্সিকো গভর্নর বিল রিচার্ডসনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে অনুদান দিয়েছিলেন। একই ক্যাম্পেইনে জেফরি এপস্টেইন নিজে ৫০ হাজার ডলার ঢেলেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে ঋণখেলাপী একজন ব্যক্তি বিদেশে কোন টাকায় রাজনৈতিক অনুদান দিলেন? আর কেনই বা তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদকে সমর্থন করলেন যার বিরুদ্ধে শিশু পাচার চক্রে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে?
বিএনপি নামক এই দলটির ইতিহাস জুড়ে রয়েছে অপকর্মের এক বিস্তৃত তালিকা। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া এই দলটি গণতন্ত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর মূল চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, রাজাকারদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়ে ওঠে এই দলের বৈশিষ্ট্য। সময়ের সাথে সাথে এই দলের কর্মকাণ্ড আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে, কিন্তু নৈতিকতা আর জবাবদিহিতার প্রশ্নে তারা সব সময়ই পিছিয়ে থেকেছে।
মিন্টুর বিদেশে অনুদানের ঘটনা আসলে বিএনপির একটি পুরনো চরিত্রের নতুন প্রকাশ মাত্র। দেশে ঋণখেলাপী হয়ে জনগণের টাকা মেরে দেওয়া, ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করা, এরপর সেই টাকা বিদেশে পাচার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা এই দলের নেতাদের একটি পরিচিত প্যাটার্ন। দেশের সাধারণ মানুষ যখন তাদের আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য লড়াই করে, তখন এই নেতারা বিদেশে বসে অন্য দেশের রাজনীতিবিদদের পকেট ভারী করেন। এর চেয়ে বড় বেইমানি আর কী হতে পারে?
আরও চিন্তার বিষয় হলো, মিন্টু যাকে সমর্থন করেছিলেন সেই বিল রিচার্ডসনের বিরুদ্ধে শিশু পাচার চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ একাধিকবার আদালতের নথিতে এসেছে। ভুক্তভোগীরা তাদের জবানবন্দিতে রিচার্ডসনের নাম উল্লেখ করেছেন। যদিও রিচার্ডসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবু এপস্টেইনের মতো একজন কুখ্যাত যৌন অপরাধীর সাথে একই ক্যাম্পেইনে অনুদান দেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কেন এমন একটি ক্যাম্পেইনে যুক্ত হলেন, সেটা তদন্তের দাবি রাখে। এই সংযোগ কি শুধুই রাজনৈতিক বিনিয়োগ, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে যে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল, তার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা এবং সামরিক বাহিনীর মদদ ছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিএনপির ভূমিকা কী ছিল, সেটা এখন আর কারও কাছে অজানা নয়। দলটি সব সময়ই গণতান্ত্রিক পথের বাইরে গিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে সামনে রেখে একটি অবৈধ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত স্বৈরশাসনেরই নামান্তর।
বিএনপির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এমন কোনো অপকর্ম নেই যা এই দল করেনি। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থ পাচার থেকে শুরু করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা পর্যন্ত সব কিছুতেই তাদের হাত রয়েছে। দলের নেতারা বারবার প্রমাণ করেছেন যে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত। জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা, তারপর সেই টাকা দিয়ে বিদেশি রাজনীতিবিদদের খুশি করার চেষ্টা করা, এসব কাজ যেন এই দলের নেতাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
আব্দুল আওয়াল মিন্টুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। তিনি দেশে ঋণখেলাপী হিসেবে চিহ্নিত, অথচ বিদেশে তিনি রাজনৈতিক অনুদান দিচ্ছেন। এর মানে কি এই নয় যে তিনি দেশের টাকা পাচার করে বিদেশে নিজের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করেছেন? ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে না শোধ করা, তারপর সেই টাকা বিদেশে নিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব কিনতে চাওয়া, এটা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটা জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা। আর এই কাজটি করেছেন একজন বিএনপি নেতা, যা দলটির চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর বাংলাদেশে এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মূলধারার অনেক গণমাধ্যম এই খবর চেপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যে গণমাধ্যমগুলো প্রতিদিন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করে, তারা এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে নীরব থাকছে কেন? এর পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক চাপ আছে, নাকি নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা এই খবর এড়িয়ে যাচ্ছে?
জনগণের জানার অধিকার আছে যে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে আসা রাজনীতিবিদরা আসলে কী ধরনের মানুষ। একজন ঋণখেলাপী যিনি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন, তিনি কীভাবে জনগণের প্রতিনিধি হতে পারেন? আর যিনি বিদেশে গিয়ে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন রাজনীতিবিদকে সমর্থন করেছেন, তার নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অযৌক্তিক?
বিএনপির এই ধরনের কার্যক্রম নতুন নয়। দলটির প্রতিষ্ঠা থেকেই এর মধ্যে একটি স্ববিরোধিতা কাজ করেছে। একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলা, অন্যদিকে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা। একদিকে জনগণের অধিকারের কথা বলা, অন্যদিকে জনগণের টাকা লুট করা। একদিকে আইনের শাসনের কথা বলা, অন্যদিকে নিজেরাই আইন লঙ্ঘন করা। এই দ্বৈত চরিত্র বিএনপিকে একটি অবিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য বিএনপির মতো দলগুলোর দায় এড়ানোর উপায় নেই। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল, যেখানে বিদেশি শক্তি, ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী এবং সামরিক বাহিনীর একাংশ একসাথে কাজ করেছে। এই ষড়যন্ত্রের ফলে একটি নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়েছে এবং দেশে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিকে সামনে রাখা হয়েছে, কিন্তু আসলে পেছন থেকে কারা সুতা টানছেন, সেটা এখন আর গোপন নেই।
এই পুরো পরিস্থিতিতে বিএনপির ভূমিকা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। কিন্তু বিএনপির ইতিহাস বলে যে এই দল কখনোই নিজেদের দোষ স্বীকার করেনি, কখনোই জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে চায়নি।
দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা বুঝতে পারছেন কে তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে আর কে শুধু নিজের স্বার্থ দেখছে। যে নেতা দেশের টাকা মেরে বিদেশে পাচার করেন, যিনি বিদেশে গিয়ে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের সমর্থন করেন, তিনি কখনোই দেশের কল্যাণ চাইতে পারেন না। বিএনপির মতো দলগুলো যতদিন এই ধরনের নেতাদের আশ্রয় দেবে, ততদিন তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
এপস্টেইন ফাইলে মিন্টুর নাম উঠে আসা শুধু একটি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়, এটা বিএনপির সামগ্রিক চরিত্রের একটি প্রতিফলন। দলটি যে শুধু দেশের ভেতরে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসে জড়িত তা নয়, বিদেশেও তারা এমন সব কার্যকলাপে যুক্ত যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। একজন বাংলাদেশি নেতা যখন এপস্টেইনের মতো কুখ্যাত অপরাধীর সাথে একই ক্যাম্পেইনে অনুদান দেন, তখন পুরো দেশকেই লজ্জিত হতে হয়।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিএনপি কখনোই এই পথে হাঁটবে না। কারণ দলটির মূল ভিত্তিই তৈরি হয়েছে এই ধরনের অপকর্মের ওপর। জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন থেকেই এই দলের চরিত্র নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল, দুর্নীতিপরায়ণ এবং জনবিচ্ছিন্ন এই দল কখনোই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারেনি। তাই মিন্টুর মতো নেতাদের আশ্রয় দেওয়া এই দলের জন্য স্বাভাবিক।

