জামাত-শিবির আর বিএনপির ক্ষমতার খেলা যদি বুঝতে চান, তাহলে ডাকসুর দিকে একবার তাকান। পুরো ব্যাপারটাই একটা টেমপ্লেট, একটা ব্লুপ্রিন্ট। জুমা, সর্বমিত্র, রাফিয়া এরা সামনে থাকে, মুখ থাকে তাদের, কিন্তু সিদ্ধান্ত, কৌশল, পরিকল্পনা সব আসে পেছন থেকে। এবি জুবায়ের, মোসাদ্দেক রাহমান এরা পলিটিক্যাল কাজকর্ম করেন ঠিকই, কিন্তু শিবিরের সাপোর্ট ছাড়া তারা একদিনও টিকতে পারবেন না। এটা কোনো গোপন বিষয় না, সবাই জানে, কিন্তু কেউ খোলাখুলি বলতে চায় না।
সর্বমিত্রের ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার। লোকটা জুলাই দাঙ্গায় একটাও পোস্ট দেয়নি। কেন? কারণ সে জানে তার চাকমা পরিচয়টাই তার আসল পুঁজি। সে যদি মাদ্রাসার ছাত্র হতো, কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাত না। কিন্তু উপজাতি পরিচয় দিয়ে শিবির তাদের পুরো এজেন্ডা চালিয়ে নেয়, ভোট কামিয়ে নেয়। ধানমন্ডি ৩২-এ শিবিরের কোনো বড় নেতা যায় না কখনো। যায় রাফিয়ার মতো মেয়েরা, যাদের দেখলে মনে হবে একদম নিরীহ, ভদ্র। কিন্তু কাজ কী হয়? শিবিরের কাজ, শিবিরের এজেন্ডা।
মির্জা আব্বাসকে অ্যাটাক করতে হলে সাদিক কায়েম সামনে আসে না, ফেসবুকে ইনডিরেক্ট পোস্ট মারে। এস এম ফরহাদ মুখ দেখায় না, জুমাকে পাঠায় সামনে। এটাই তাদের কৌশল। এটা দেখতে বিরক্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু এটা ভয়ংকরভাবে কাজ করে। জামাত-বিএনপি যেটা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, সেটা আওয়ামী লীগ না, সেটা হলো অ্যাকাউন্টিবিলিটি। দায়বদ্ধতা। কোনো কিছুর দায় নিতে তারা রাজি না। আর এটাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে লাভজনক ফর্মুলা।
জুলাইয়ের পুরো ঘটনাটা ছিলো একটা সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান। বিদেশি ফান্ডিং ছিলো, জঙ্গিগোষ্ঠীর সহায়তা ছিলো, মিলিটারির সমর্থন ছিলো। একটা নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দিয়ে ইউনূসকে বসিয়ে দেওয়া হলো। এখন যেটা চলছে, সেটা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না, এটা একটা অবৈধ ক্ষমতা দখল। আর এই ক্ষমতা দখলের পেছনে যারা আছে, তারা হলো জামাত-বিএনপি।
এখন জাতীয় নির্বাচন হলে যদি জামাত জেতে, তাহলে কী হবে? ডাকসুর স্ট্র্যাটেজিই পুরো দেশে চালু হবে। দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা, ডিবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব জায়গায় তারা এমন মানুষ বসাবে যাদের নামে বিএনপি-জামাতের ট্যাগ নেই। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী থাকবে, এনজিও ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ থাকবে, কিন্তু ভেতরে সব কন্ট্রোল থাকবে জামাত-বিএনপির হাতে। সিদ্ধান্ত হবে তাদের, কাজ হবে তাদের, কিন্তু দায় নেবে অন্যরা।
দেশে যা কিছু ঘটবে, যত নিপীড়ন হবে, যত মানুষ গুম হবে, যত সংখ্যালঘু নির্যাতিত হবে, সব হবে নীরবে। আওয়াজ উঠবে না, কারণ যারা আওয়াজ তুলতে পারে তারা হয় জেলে থাকবে, নয়তো লাশ হয়ে যাবে। মানুষ বুঝবে কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু দোষ দিতে পারবে না কাউকে, কারণ কোনো মুখ থাকবে না সামনে। জামাত-বিএনপি থাকবে ছায়ার মতো, নিয়ন্ত্রণ করবে সবকিছু, কিন্তু দেখা যাবে না কোথাও।
আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন এই দেশগুলোর কথা চিন্তা করেন। সেখানে কী হয়েছিলো? গণতন্ত্র শেষ, মানবাধিকার শেষ, নারীদের অধিকার শেষ, শিক্ষা শেষ, স্বাধীনতা শেষ। সেখানে মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু বাঁচে না। বাংলাদেশে জামাত-বিএনপি ক্ষমতায় এলে ঠিক এই পথেই যাবে দেশ। ধীরে ধীরে সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হবে, মিডিয়া কন্ট্রোল হয়ে যাবে, বিচার বিভাগ পুতুল হয়ে যাবে, আর সাধারণ মানুষ হয়ে যাবে নিঃশব্দ ভিকটিম।
জুলাইয়ের দাঙ্গা ছিলো একটা পরিকল্পিত ঘটনা। সেখানে যারা নামছিলো, তাদের অনেকেই জানতো না তারা কীসের জন্য লড়ছে। কিন্তু যারা পরিকল্পনা করেছিলো, তারা ঠিকই জানতো কী করছে। একটা গণতান্ত্রিক সরকারকে ফেলে দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে জামাত-বিএনপির কন্ট্রোল আছে কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই।
এখন যদি মনে করেন যে এই পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে, তাহলে ভুল করছেন। ডাকসুতে যেমন জুমা-সর্বমিত্র-রাফিয়ারা মুখ হয়ে আছে কিন্তু কন্ট্রোল শিবিরের, ঠিক তেমনি পুরো দেশে এই সিস্টেম চালু হবে। জামাত-বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে কিন্তু তাদের নাম থাকবে না কোথাও। আর এভাবেই তারা দেশকে নিয়ে যাবে এমন একটা অবস্থায় যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই পুরো প্রসেসটা এতই ধীর আর সূক্ষ্ম যে মানুষ বুঝতেই পারবে না কখন তারা সব হারিয়ে ফেললো। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবে দেশটা আর চেনা যাচ্ছে না, কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকবে না। জামাত-বিএনপির এই যে ছায়াযুদ্ধ, এই যে প্রক্সি ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করা, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর এই অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে তারা কীভাবে কাজ করে। ডাকসু সেই বোঝার একটা ছোট উদাহরণ মাত্র।

