আপনারা যারা এখনও ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ বলে ডাকছেন ইউনুসের এই ব্যবস্থাকে, তারা আসলে বুঝতেই পারছেন না কী হতে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক, সেটা আসলে একটা বিশাল ধোঁয়াশা। আসল খেলাটা সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়।
ইউনুস, জামাত আর সেনাবাহিনীর একাংশের এই অপবিত্র জোট যে পরিকল্পনা সাজিয়েছে, সেটা এতটাই সহজসরল যে হাসি পায়। কিন্তু এই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভয়াবহতা। কারণ সহজ পরিকল্পনা মানেই কার্যকর পরিকল্পনা। জটিল ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়, কিন্তু এই ধরনের খোলামেলা ডাকাতি? এটা তখনই ঠেকানো যায় যখন মানুষ বুঝতে পারে কী হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির যে তথাকথিত নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেটা কোনো নির্বাচন নয়। এটা একটা আইনি বৈধতার নাটক। জুলাই সনদ পাস করানোর জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটের একটা কাগজি প্রমাণ দরকার। সেই কাগজি প্রমাণটা তৈরি হবে এই প্রহসনের মাধ্যমে। আপনি ভোট দিন বা না দিন, ‘হ্যাঁ’ জিতবেই। কারণ ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ‘হ্যাঁ’ দিয়ে আসলে কী হবে? জুলাই সনদ পাস হবে। আর জুলাই সনদের আসল মর্মার্থ হলো সংবিধান পরিবর্তন। কিন্তু যে পরিবর্তন হবে, সেটা শুধু কিছু ধারা বদলানো নয়। সংবিধানে এমন কিছু ব্যবস্থা ঢুকিয়ে দেওয়া হবে যা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে, অটোমেটিকভাবে, একটা উগ্র ইসলামবাদী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।
এবং সবচেয়ে শয়তানি ব্যাপার হলো, সংবিধানে এমন একটা ধারা যুক্ত করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এই সংবিধান পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। সংসদের প্রতিটা দলের সম্মতি লাগবে। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব দলের ঐকমত্য? সেটা কখনো হবে না। তারা এটা জানে। সুতরাং যে সংবিধান একবার করা হবে, সেটা হয়ে যাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
ইউনুসের ব্যক্তিগত স্বার্থও এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। পরিবর্তিত সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ হবে ক্ষমতাশালী, প্রধানমন্ত্রীর সমান বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। ইউনুস চান সেই পদে বসে আজীবন ক্ষমতা ভোগ করতে। একজন অনির্বাচিত সুদখোর মহাজন, যিনি গরিবদের ঋণের জালে ফেলে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন, তিনি হবেন বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আর জুলাইয়ের গণহত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের সবাইকে সাংবিধানিক দায়মুক্তি দেওয়া হবে।
নির্বাচনের প্রহসনটা কীভাবে সাজানো হয়েছে, সেটাও জানা দরকার। সেনাবাহিনী থাকবে বাইরে, বেরিকেড দিয়ে। ভিতরে কারচুপির জন্য লোক সেট করা আছে। যদি ভোটকেন্দ্রে কিছু গোলমাল হয়, তাহলে গণনার সময় ইঞ্জিনিয়ারিং করা হবে। যদি সেখানেও সমস্যা হয়, তাহলে ইনপুট বদলে ফেলার ব্যবস্থা আছে। আর শেষ পর্যায়ে যদি বিএনপি ভোট না মানে বা বয়কট করে, তাহলে সেনাবাহিনীর লাঠি-বুট।
এখন ধরুন, কোনোভাবে বিএনপি সব বাধা পেরিয়ে জিতে গেল। তখন কী হবে? জামাত বয়কট করবে। আর ইউনুস সাথে সাথে সেই বয়কটকে বৈধতা দিয়ে পুরো নির্বাচন বাতিল করে দেবে। এটাই শেষ পরিকল্পনা। লাস্ট স্টেপ। কারণ নির্বাচন বাতিল মানে ইউনুস আরও দুই বছর ক্ষমতায়। সেই সময়ে জুলাই সনদ, সংবিধান পরিবর্তন, সব কিছু সেরে ফেলা যাবে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সংসদ নির্বাচন বাতিল হলেও গণভোটের ফলাফল থেকে যাবে। ‘হ্যাঁ’ কে বৈধ হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। কারণ ওটাই আসল লক্ষ্য। সংসদ নির্বাচন তো ছিল শুধু চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য।
জামাত এই খেলায় রাজি কেন? কারণ তারা জানে, ইউনুস যদি ক্ষমতায় থেকে সংবিধানে ইসলামবাদী ধারা ঢুকিয়ে দেয়, রাষ্ট্রকে ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সেটা জামাতের সরাসরি ক্ষমতায় আসার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। কারণ সরকার পরিবর্তন হলেও সংবিধান থেকে যাবে। আর সেই সংবিধান নিজেই হবে ইসলামবাদী রাষ্ট্রের নির্মাতা।
ইউনুস, সেনাবাহিনীর একাংশ আর জামাত। এই তিনের জোট এতটাই বিপজ্জনক কারণ এদের স্বার্থ এক জায়গায় মিলে গেছে। ইউনুস চান ব্যক্তিগত ক্ষমতা আর জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে মুক্তি। জামাত চায় বাংলাদেশকে ইসলামবাদী রাষ্ট্র বানানো। সেনাবাহিনীর যে অংশ এতে জড়িত, তারা চায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা।
এবং পুরো ব্যাপারটার পেছনে আছে বিদেশি অর্থায়ন আর ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা। জুলাইয়ের দাঙ্গা, যেটায় শত শত মানুষ মারা গেছে, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। সেটা ছিল পরিকল্পিত সন্ত্রাস। আর সেই সন্ত্রাসের মাধ্যমে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। এটাকে যতই ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলে চালানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, বাস্তবতা হলো এটা একটা সামরিক-মৌলবাদী অভ্যুত্থান।
বিএনপিও এই খেলায় পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তারেক রহমান হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে জামাত-ইউনুস জোট তাকে ব্যবহার করবে আর শেষে ফেলে দেবে। তাই তিনি ইউনুসের সাথে দেখা করে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে তিনি জুলাই সনদের পক্ষে। কিন্তু জামাত-ইউনুস জোট জানে যে বিএনপি জিতে গেলে পরে তাদের অবস্থান বদলাতে পারে। তাই বিএনপিকে জেতানোর ঝুঁকি তারা নেবে না। প্রয়োজনে বিএনপিকে হারিয়ে জামাতকে জিতিয়ে আনা হবে। অথবা পুরো নির্বাচনই বাতিল করে দেওয়া হবে।
পুরো পরিকল্পনাটা এত নিখুঁত কারণ এর প্রতিটা স্তরে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা আছে। একটা না হলে আরেকটা। শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ জিতবেই। জুলাই সনদ পাস হবেই। সংবিধান বদলে যাবেই। আর বাংলাদেশ ঢুকে যাবে এমন এক অন্ধকারে যেখান থেকে ফিরে আসা হবে প্রায় অসম্ভব।
যারা মনে করছেন এটা অতিরঞ্জন, তাদের বলি, জুলাইয়ের আগেও কি কেউ বিশ্বাস করত যে দেশের রাস্তায় এভাবে মানুষ মারা যাবে? একটা নির্বাচিত সরকারকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া হবে? একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি এসে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হয়ে বসবে? আর পুলিশের জায়গায় সেনাবাহিনী নামবে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখন একটা সন্ধিক্ষণে। হয় এই ষড়যন্ত্র সফল হবে, আর দেশ হয়ে যাবে একটা ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তচিন্তা সব শেষ হয়ে যাবে। নয়তো মানুষ জেগে উঠবে, এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কিন্তু জেগে ওঠার সময় কত বাকি, সেটাই এখন প্রশ্ন।

