মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত নিধন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী, অন্যদিকে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি এবং নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার ত্রিমুখী সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংলগ্ন জনপদে।
তবে এই পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ আশঙ্কার কথা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অদক্ষতা এবং পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের ফাঁদে পড়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড দখল বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকার যখন চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই মার্কিন অর্থায়নে বিদ্রোহীদের আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আরসা, আরএসও ও নবী হোসেন গ্রুপের মধ্যে চলমান ভয়াবহ গোলাগুলি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বাংলাদেশেসহ এই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করতে আমেরিকা বিদ্রোহীদের অর্থায়ন করছে। মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের একটি কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউনূসের এই অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সেই দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশারই অংশ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তার নিশ্চিত করা।
এই উত্তাল পরিস্থিতির সুযোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি ভিন্নধর্মী রাষ্ট্র বা ‘খ্রিস্টান রাজ্য’ গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকট হচ্ছে, যা অনেকটা পূর্ব তিমুরের ঘটনার পুনরাবৃত্তির মতো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবনা এসেছিল এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি বিদেশি এয়ারবেজ স্থাপনের চাপ দেওয়া হয়েছিল।
একাধিক সূত্র ও বিশ্লেষকের দাবি, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে । এর ফলে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা ও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে গভীর সংকটে ফেলছে।
একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান-জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীতে বিশেষ গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান তৎপরতা রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আরাকান আর্মি ইতিমধ্যে রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তের একদম কাছে অবস্থান নিয়েছে এবং সীমান্তজুড়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে প্রাণঘাতী মাইন পুঁতে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও নির্বাচিত সরকার ছাড়া কেবল অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মাধ্যমে এই বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত অভ্যন্তরীণ সংহতি বৃদ্ধি এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে পার্বত্য অঞ্চলসহ বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মত দিয়েছেন তারা।

