২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে পরিকল্পিত দাঙ্গা সংগঠিত করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে মুহাম্মদ ইউনুস ও তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদ যেভাবে ক্ষমতায় টিকে আছে, তা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এই ক্যু, ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সহায়তায় সংঘটিত হয়েছিল এবং সামরিক বাহিনীর একাংশের মৌন সমর্থনে সফল হয়েছিল। এখন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে এই অবৈধ সরকার যে গণভোটের নাটক সাজাচ্ছে, তা কেবল সাংবিধানিক নিয়মকানুনের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং জনগণের সাথে সুপরিকল্পিত প্রতারণা।
সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই মৌলিক নীতির ভিত্তিতেই গণভোট একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি তাদের মতামত প্রকাশ করে। কিন্তু ইউনুস সরকার এখন যে গণভোটের কথা বলছে, সেখানে ত্রিশটি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়বস্তু গোপন রাখার যে ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে, তা সংবিধানের মৌলিক চেতনার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের মতামত চাওয়া কোনো গণভোট নয়, এটি প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়বস্তু জনগণের কাছে প্রকাশ না করে কীভাবে তাদের কাছে মতামত চাওয়া সম্ভব? একজন ভোটার যখন ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়াবেন, তিনি ঠিক কী বিষয়ে হ্যাঁ বা না বলছেন সেটা না জেনেই কি তাকে ভোট দিতে বলা হবে? এ তো কেবল অগণতান্ত্রিক নয়, এ হচ্ছে জনগণের বুদ্ধিমত্তা ও অধিকারের প্রতি চরম অবমাননা। সংবিধান স্বীকৃত জানার অধিকার, স্বচ্ছতার নীতি এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সব মৌলিক শর্ত এখানে পদদলিত হচ্ছে।
গণভোটের আগে যদি সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে জনগণ কোনোভাবেই সচেতন ও অবগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এমন একটি ভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। আসলে এটি কার্যত জনগণের সাথে সুপরিকল্পিত প্রতারণা। একটি অবৈধ সরকার, যার নিজের কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, সেই সরকার এখন জনগণকে অন্ধকারে রেখে একটি ভোটের আয়োজন করছে। এটা কেমন গণতন্ত্র? এটা কোন ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া?
এই পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য নয়, আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক। সংবিধানের যেকোনো আদালতে এই গণভোট চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব এবং নিশ্চিতভাবেই এটি আদালতে টিকবে না। কারণ সংবিধান যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে, সেখানে এই গোপনীয়তা সরাসরি সেসব নীতি লঙ্ঘন করছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব ধারণ করে, সে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হতে পারে না। কিন্তু যদি নির্বাচন কমিশন কোনো অযোগ্য প্রার্থীকে, যেমন দ্বৈত নাগরিককে, মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে, তাহলে সেটি স্পষ্টতই আইন-বিরুদ্ধ। নির্বাচন আইন ২০০৮-এর ধারা ৬৭ অনুযায়ী প্রার্থীকে অবশ্যই নির্বাচনী যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। যদি কোনো অযোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন পায় এবং ভোটে অংশ নেয়, তাহলে সেই নির্বাচনের ফলাফল আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে এমন অবৈধ মনোনয়ন বাতিল করার আদেশ চাওয়া সম্ভব। সংবিধানের ১০১ থেকে ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সংবিধান লঙ্ঘন হয় বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, যেমন নির্বাচন কমিশন, বেআইনি পদক্ষেপ নেয়, তাহলে হাইকোর্টে রিট করা যায়। রিটের মাধ্যমে মনোনয়ন বাতিল এবং প্রয়োজনে নির্বাচন স্থগিত করার আবেদন করা যায়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরেও যদি প্রমাণিত হয় যে প্রার্থী অযোগ্য ছিল, তাহলে উচ্চ আদালতে গিয়ে সেই ফলাফল চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। নির্বাচন আইন ২০০৮-এর ধারা ৬৯ স্পষ্টভাবে বলে যে অযোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলে সেই নির্বাচন বাতিল করা যায়।
এখানে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যদি কমিশন সচেতনভাবে কোনো অযোগ্য প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করে, তাহলে সেটি তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার লঙ্ঘন। হাইকোর্ট কমিশনকে সতর্ক করতে পারে, মনোনয়ন বাতিল করার নির্দেশ দিতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে পারে। যদিও আদালত সাধারণত কমিশনারদের সরাসরি শাস্তি দেয় না বিশেষ কারণ ছাড়া, কিন্তু অবৈধ মনোনয়ন ও নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের আছে।
সুদী মহাজন ইউনুস এবং তার অবৈধ উপদেষ্টা পরিষদের এই পুরো তালবাহানা জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। একটি ক্যু-র মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার যখন গণভোটের নামে নতুন প্রহসন শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তারা আসলে তাদের অবৈধ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ার ভিত্তিই সাংবিধানিক নীতি লঙ্ঘনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই প্রক্রিয়া কখনো বৈধতা পেতে পারে না।
এই সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি প্রভুদের নির্দেশে, ইসলামি জঙ্গিদের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অবৈধ কাঠামো এখন সংবিধান ও গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত। ত্রিশটি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়বস্তু গোপন রেখে গণভোটের আয়োজন করা শুধু অসাংবিধানিক নয়, এটি জনগণের সাথে সরাসরি প্রতারণা।
ইউনুস সরকারের এই গণভোট প্রহসন বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি কালো দাগ হয়ে থাকবে। একটি অবৈধ সরকার, যার কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, সেই সরকার জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চাইছে। এর চেয়ে বড় ঔদ্ধত্য আর কী হতে পারে? এর চেয়ে বড় সাংবিধানিক লঙ্ঘন আর কী হতে পারে? জনগণের অধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি রক্ষার জন্য এই প্রহসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই অপরিহার্য।

