বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে। ক্ষমতা যখন অবৈধ পথে আসে, তখন তার ভিত্তি দাঁড়ায় ষড়যন্ত্রের ওপর, জনগণের ইচ্ছার ওপর নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমরা দেখলাম কীভাবে পরিকল্পিত দাঙ্গা দিয়ে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো। আর সেই ক্ষমতা দখলের পেছনে যারা ছিল, তারা আজ দেশকে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে যেখান থেকে বেরোনোর পথ ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে।
ইউনুস নামের এই মানুষটা নিজেকে শান্তির দূত বলে চালাতে চান, অথচ তার হাত ধরে ক্ষমতায় এসেছে যারা, তাদের ইতিহাস রক্তাক্ত। জামাত, বিএনপি আর তাদের পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলো মিলে এমন একটা জোট তৈরি করেছে যেটা শুধু ক্ষমতার লোভে অন্ধ। এই জোটের পেছনে আছে বিদেশি অর্থায়ন, আছে জঙ্গি সংগঠনের গোপন সহায়তা, আর আছে সেনাবাহিনীর একাংশের নীরব সমর্থন। একটা দেশের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ সমন্বয় আর কী হতে পারে?
যে বিএনপি জিয়াউর রহমানের হাতে জন্মেছিল সেনানিবাসে, সেই দল আজও সামরিক ছত্রছায়া ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। এই দলের রাজনীতির ইতিহাস মানেই দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের ইতিহাস। তারপরও তারা নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করে। কোন গণতন্ত্র? যে গণতন্ত্রে ভোট হয় পেট্রোলবোমায়, যেখানে নির্বাচন মানে রক্তপাত?
ইউনুসের চাপাবাজির উৎস খোঁজা খুব কঠিন কিছু নয়। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলো যারা তাকে নোবেল পুরস্কারের আড়ালে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে স্থানীয় জঙ্গি আর মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো যারা দেশে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইউনুস খেলছেন তার খেলা। সুদের ব্যবসা দিয়ে গরিব মানুষকে আরও গরিব করে যে মানুষ বিখ্যাত হয়েছিলেন, সেই মানুষই আজ দেশ চালানোর দাবি করছেন।
এখন দেশের অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। এটা কোনো ছোট বিষয় নয়। একটা দেশের সুনাম যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন বুঝতে হবে ভেতরে কতটা পচন ধরেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া তো আগে থেকেই কড়াকড়ি করছিল, এখন ইউরোপও একই পথে। আর আফ্রিকার দেশগুলো? ওরাও হয়তো শীঘ্রই একই সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ কেউ চায় না তাদের দেশে এমন রাজনৈতিক অস্থিরতার বাসিন্দারা আসুক।
এই যে বিচ্ছিন্নতা, এই যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে দূরে সরে যাওয়া, এর দায় কার? যারা ক্যু করে ক্ষমতা নিয়েছে, যারা জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই দেশ চালাচ্ছে, তাদের। ইউনুস আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়তো ভাবছেন বিদেশি প্রভুদের খুশি রাখতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে দেশের নিজস্ব কোনো গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই, সে দেশকে কেউ সম্মান করে না।
জামাত আর বিএনপির এই অপবিত্র মিলন দেশের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে। জামাত যারা একাত্তরে এদেশের মানুষ হত্যা করেছিল, তারা আজ ক্ষমতার অংশীদার। বিএনপি যারা প্রতিবার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির নতুন রেকর্ড গড়েছে, তারা আজ সংস্কারের কথা বলছে। এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?
তরুণরা এই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের বুঝতে হবে এই রাজনৈতিক নাটকের আসল চেহারা। ইউনুসের মাইক্রোক্রেডিট মডেল যেমন গরিবদের ঋণের জালে আটকে ফেলেছিল, তার রাজনীতিও ঠিক তেমনি দেশকে নির্ভরশীলতার জালে আটকে ফেলছে। বিদেশি টাকায় চলা সরকার কখনো দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় টিকে থাকা শাসনব্যবস্থা কখনো শান্তি আনতে পারে না।
যে দেশে একসময় শিক্ষার্থীরা, তরুণরা স্বপ্ন দেখত বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করার, ক্যারিয়ার গড়ার, সেই দেশের পাসপোর্ট এখন অবাঞ্ছিত হয়ে উঠছে। এটা শুধু ভিসা সমস্যা নয়, এটা আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। আর এই মর্যাদা নষ্ট করেছে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসে আছে, তারা।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, যে সামরিক বাহিনী দেশ রক্ষার জন্য, তারাই এই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সমর্থন দিয়েছে। সেনাবাহিনীর কাজ রাজনীতি করা নয়, দেশের সীমানা রক্ষা করা। কিন্তু যখন তারা রাজনৈতিক খেলায় জড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
দেশের তরুণদের এখন চোখ খুলে দেখতে হবে। এই যে দেশ থেকে মানুষ পালাতে চাইছে, এর পেছনে কারা দায়ী। এই যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সম্মান নষ্ট হচ্ছে, এর জন্য কারা দায়ী। ইউনুস, বিএনপি, জামাত এই তিন শক্তির জোট দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞে ইন্ধন জোগাচ্ছে বিদেশি টাকা আর স্থানীয় জঙ্গিবাদ।
প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে বেরোনোর পথ কী? উত্তর খুব সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রথমেই দরকার সচেতনতা। তরুণদের বুঝতে হবে কারা তাদের শত্রু, কারা তাদের ব্যবহার করছে। দ্বিতীয়ত, দরকার ঐক্য। যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ বিভক্ত থাকবে, ততক্ষণ এই অবৈধ শক্তিগুলো ক্ষমতায় টিকে থাকবে।
ইউনুসের যে চাপাবাজি, সেটা আসলে ভিতু মানুষের চাপাবাজি। যার নিজের কোনো গণভিত্তি নেই, যাকে বিদেশি প্রভুরা বসিয়ে রেখেছে, সে কতদিন টিকবে? ইতিহাস বলে, জনবিচ্ছিন্ন শাসকরা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তারা হয় পালিয়ে যায়, নয়তো ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
বিএনপির যে ইতিহাস, তা দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের। জিয়াউর রহমান যে দল তৈরি করেছিলেন সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে, সেই দল আজও সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে। তারা কখনো জনগণের কথা ভাবেনি, ভাবে শুধু নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থের কথা।
আর জামাত? যাদের হাত এদেশের লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত, তারা আজ মন্ত্রী হচ্ছে, নীতিনির্ধারক হচ্ছে। এর চেয়ে বড় অপমান এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য আর কী হতে পারে? এই প্রশ্ন প্রতিটা সচেতন নাগরিকের করা উচিত।
দেশ আজ এক অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, অন্ধকারের পরেই আসে আলো। দরকার শুধু ধৈর্য, সচেতনতা আর সঠিক পথে চলার দৃঢ় সংকল্প। ইউনুস আর তার দোসররা হয়তো এখন ক্ষমতায়, কিন্তু চিরকাল থাকবে না। কারণ মিথ্যার পা নেই, সত্য একদিন প্রকাশ হবেই।

