নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এবং সমসাময়িক ঘটনাবলিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের আড়ালে মূলত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ফুটে উঠেছে, যার লক্ষ্য নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া।
শনিবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ইসি নিজেদের সংশোধন না করলে প্রয়োজনে কমিশন পুনর্গঠন করে দেরিতে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। কোনো বিদেশি নাগরিক বা ঋণখেলাপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকদের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “ইসি বিএনপিকে অন্যায্য সুযোগ দিচ্ছে।” দিনের শুরুতে ইসির আপিল শুনানিতে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং বিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসিফ মাহমুদ এই কঠোর অবস্থান নেন।
অভিযোগ উঠছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক শক্তির মদদে আসন্ন নির্বাচন বানচালের মিশনে নেমেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইনকিলাম মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, তথাকথিত ‘জুলাই বিপ্লবের’ দোহাই দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখা হচ্ছে যাতে নির্বাচনের পরিবেশ নেই—এই অজুহাতে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের স্বার্থে ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিনিময়ে তাকে জাতিসংঘ মহাসচিবের মতো বড় কোনো আন্তর্জাতিক পদের প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (আইপিএস) বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ওয়াশিংটন। বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমাতে বাংলাদেশে একটি অনুগত সরকার থাকা তাদের জন্য জরুরি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা সেই শঙ্কা আবার সামনে আনছেন। চট্টগ্রাম বন্দর ও এই অঞ্চলে একটি বিদেশি ‘এয়ার বেজ’ স্থাপনের প্রস্তাব এই নীল নকশারই অংশ কি না, তা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর পাকিস্তান-জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সমন্বয়কে সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি। তাদের মতে সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে। অন্যথায়, বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক হওয়ার মাশুল দীর্ঘকাল ধরে জাতিকে দিতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

