Saturday, January 24, 2026

৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট: মানবিকতা, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আত্মঘাত

৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে ইউনূস সরকার”—এই তথ্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এক গভীর ও স্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নন। তারা মিয়ানমারের নাগরিক, যাদের ওপর সে রাষ্ট্র পরিকল্পিত নিপীড়ন ও জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আশ্রয় দেওয়া আর নাগরিকত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।

১৯৫১ সালের Refugee Convention এবং ১৯৬৭ সালের Protocol Relating to the Status of Refugees স্পষ্টভাবে বলে—শরণার্থীদের সুরক্ষা দিতে হবে, তাদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, কিন্তু তাদের নাগরিক বানানো কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। আন্তর্জাতিক আইনে “asylum” মানে অস্থায়ী সুরক্ষা, “citizenship” মানে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় পরিচয়। এই দুটি গুলিয়ে ফেললে তা আইনি বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম অধিকারগুলোর একটি। Universal Declaration of Human Rights (UDHR)–এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের অধিকার স্বীকৃত হলেও, এটি কোনো রাষ্ট্রকে বাধ্য করে না যে তারা যে কাউকে নাগরিকত্ব দেবে। বরং প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিক হওয়ার জন্য জন্মসূত্র, বংশানুক্রম, অথবা দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাসের মতো শর্ত রয়েছে। শরণার্থী হিসেবে অবস্থান এসব শর্ত পূরণ করে না। যদি এই আইন উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তবে তা হবে সরাসরি আইনের শাসনের অবমাননা।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো জাতীয় নিরাপত্তা। পাসপোর্ট মানে কেবল ভ্রমণের কাগজ নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র। এটি বহনকারী ব্যক্তি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। ৬৯ হাজার মানুষের পরিচয় বদল মানে একটি বিশাল নিরাপত্তাগত ঝুঁকি।

International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)–এর ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সীমান্ত ও চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়—কারণ এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। যদি ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, অপরাধ ইতিহাস, নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ছাড়া এই মানুষদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তবে তা হবে একটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা। আরো বড় প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে কোথায় নিয়ে যাবে? এতদিন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি করে এসেছে—রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান। জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজুলেশনেও এই অবস্থান সমর্থিত হয়েছে।

এখন যদি বাংলাদেশ নিজেই তাদের নাগরিকত্ব দেয়, তবে তা কার্যত মিয়ানমারের বক্তব্যকে বৈধতা দেবে—যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি। এর ফলে প্রত্যাবাসনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ক্ষয় হবে এবং সংকট স্থায়ী হয়ে যাবে। এটি শুধু কূটনৈতিক ভুল নয়; এটি হবে একটি ভূ-রাজনৈতিক আত্মঘাত।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। নাগরিকত্ব যদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়, তবে সেটি আর নাগরিকত্ব থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি নির্বাচনী অস্ত্র। ইতিহাস বলে, ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।

মানবিকতা মানে আইন ভাঙা নয়। মানবিকতা মানে ভবিষ্যৎ বিপন্ন করা নয়। মানবিকতা মানে রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় বিসর্জন দেওয়া নয়। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে—এটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তাদের নাগরিক বানানো কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। বরং এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের আইনি কাঠামো, নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে ধ্বংস করতে পারে।

রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে নীতিতে। রাষ্ট্র টিকে থাকে দয়ায় নয়, শৃঙ্খলায়। এখানে প্রশ্ন কেবল ৬৯ হাজার মানুষের নয়—প্রশ্ন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়।

৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে ইউনূস সরকার”—এই তথ্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এক গভীর ও স্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নন। তারা মিয়ানমারের নাগরিক, যাদের ওপর সে রাষ্ট্র পরিকল্পিত নিপীড়ন ও জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আশ্রয় দেওয়া আর নাগরিকত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।

১৯৫১ সালের Refugee Convention এবং ১৯৬৭ সালের Protocol Relating to the Status of Refugees স্পষ্টভাবে বলে—শরণার্থীদের সুরক্ষা দিতে হবে, তাদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, কিন্তু তাদের নাগরিক বানানো কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। আন্তর্জাতিক আইনে “asylum” মানে অস্থায়ী সুরক্ষা, “citizenship” মানে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় পরিচয়। এই দুটি গুলিয়ে ফেললে তা আইনি বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম অধিকারগুলোর একটি। Universal Declaration of Human Rights (UDHR)–এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের অধিকার স্বীকৃত হলেও, এটি কোনো রাষ্ট্রকে বাধ্য করে না যে তারা যে কাউকে নাগরিকত্ব দেবে। বরং প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিক হওয়ার জন্য জন্মসূত্র, বংশানুক্রম, অথবা দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাসের মতো শর্ত রয়েছে। শরণার্থী হিসেবে অবস্থান এসব শর্ত পূরণ করে না। যদি এই আইন উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তবে তা হবে সরাসরি আইনের শাসনের অবমাননা।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো জাতীয় নিরাপত্তা। পাসপোর্ট মানে কেবল ভ্রমণের কাগজ নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র। এটি বহনকারী ব্যক্তি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। ৬৯ হাজার মানুষের পরিচয় বদল মানে একটি বিশাল নিরাপত্তাগত ঝুঁকি।

International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)–এর ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সীমান্ত ও চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়—কারণ এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। যদি ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, অপরাধ ইতিহাস, নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ছাড়া এই মানুষদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তবে তা হবে একটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা। আরো বড় প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে কোথায় নিয়ে যাবে? এতদিন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি করে এসেছে—রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান। জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজুলেশনেও এই অবস্থান সমর্থিত হয়েছে।

এখন যদি বাংলাদেশ নিজেই তাদের নাগরিকত্ব দেয়, তবে তা কার্যত মিয়ানমারের বক্তব্যকে বৈধতা দেবে—যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি। এর ফলে প্রত্যাবাসনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ক্ষয় হবে এবং সংকট স্থায়ী হয়ে যাবে। এটি শুধু কূটনৈতিক ভুল নয়; এটি হবে একটি ভূ-রাজনৈতিক আত্মঘাত।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। নাগরিকত্ব যদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়, তবে সেটি আর নাগরিকত্ব থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি নির্বাচনী অস্ত্র। ইতিহাস বলে, ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।

মানবিকতা মানে আইন ভাঙা নয়। মানবিকতা মানে ভবিষ্যৎ বিপন্ন করা নয়। মানবিকতা মানে রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় বিসর্জন দেওয়া নয়। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে—এটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তাদের নাগরিক বানানো কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। বরং এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের আইনি কাঠামো, নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে ধ্বংস করতে পারে।

রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে নীতিতে। রাষ্ট্র টিকে থাকে দয়ায় নয়, শৃঙ্খলায়। এখানে প্রশ্ন কেবল ৬৯ হাজার মানুষের নয়—প্রশ্ন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ