অভিবাসন ইস্যুতে বিশ্বদরবারে এক নজিরবিহীন ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। ভিসা বন্ড আরোপের এক সপ্তাহের মাথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশিদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও যাতায়াতে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে আবেদনকারী ব্যক্তি যদি মার্কিন সরকারের কোনো জনকল্যাণমূলক সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তার আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কঠোর সিদ্ধান্তে অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র নিন্দা জানালেও মার্কিন প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স’-এ বাংলাদেশের পাসপোর্টের ব্যাপক অবনমন ঘটেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের সপ্তম দুর্বলতম অবস্থানে নেমে এসেছে, যেখানে মাত্র ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন আমলে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা চরম সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা এবং দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সাধারণ মানুষের বিদেশ যাত্রার ওপর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশের দুয়ার কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিসার জন্য ১৫ হাজার ডলারের বিশাল জামানত দাবি করছে, যা মূলত একটি বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। একই সঙ্গে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো স্টুডেন্ট ভিসা দিতে ব্যাপক গড়িমসি করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও দীর্ঘ সময় ধরে পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখায় সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসা ও ভ্রমণ স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শ্রমবাজারেও নেমে এসেছে অন্ধকার; সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের দুর্বল অবস্থান ও নথিপত্রের ওপর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা হারানোর ফলে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ অদূর ভবিষ্যতে শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভ্যন্তরীণভাবেও দেশ এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার মতো ঘটনাগুলো বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ড. ইউনূসের সরকার নির্বাচন বা ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না দেওয়ায় এই অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশিদের এই বিচ্ছিন্ন অবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

