মীর রুহুল আমিন ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়ার আগে হয়তো একবার ভেবেছিলেন, ৯৯ হাজার টাকার ঋণ শোধ করার জন্য সপ্তাহে ৪ হাজার ৪০০ টাকা কোথা থেকে আসবে। সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ চাষি, যার পেঁয়াজের ফসল বাজারে দাম পায়নি, সে কীভাবে এই কিস্তি দেবে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই ট্রেন এসে তার জীবন শেষ করে দিয়েছে।
আর সেই একই সময়ে মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায়, ইসলামি জঙ্গিদের মদদে এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত দাঙ্গার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেছেন। যে মানুষ জীবনভর সুদের ব্যবসা করেছেন, সেই মানুষই এখন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতায়। এই বৈপরীত্যের কথা বললে কি কেউ বিশ্বাস করবে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে রাজশাহীর পাঁচটি উপজেলার ২৪টি পরিবারের যে চিত্র উঠে এসেছে, সেখানে প্রতিটি পরিবার একাধিক এনজিওতে ঋণ নিয়েছে। এই ব্যবস্থাকে রুলফাও-এর পরিচালক আফজাল হোসেন বলেছেন ‘টার্গেট ঋণ’। মানে, এনজিওকর্মীরা তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণ করছেন। একজন মানুষের আর কোথায় কত ঋণ আছে, সেটা দেখার দায়িত্ব কারও নেই। ঋণ নিয়ে সে কী করছে, সেটাও কারও মাথাব্যথা নেই। শুধু টার্গেট পূরণ করতে হবে, কিস্তি তুলতে হবে।
শাপলা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম স্বীকার করেছেন যে তরুণ কর্মকর্তারা তাড়াহুড়া করে ঋণ দেন, গ্রাহকরা তথ্য গোপন করেন। কিন্তু এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে পুরো মাইক্রোক্রেডিট শিল্পের আসল চেহারা। এটা আসলে দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন নয়, এটা একটা লাভজনক ব্যবসা যেখানে গরিব মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে মুনাফা করা হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে মানুষ এই ব্যবস্থার জনক, তিনি যখন দেশ চালান, তখন এই সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? উত্তর সহজ, হবে না। কারণ এটাই তো তার ব্যবসায়িক মডেল। গ্রামীণ ব্যাংক এবং অসংখ্য এনজিও যে পদ্ধতিতে কাজ করে, সেখানে দরিদ্র মানুষকে ক্রমাগত ঋণের চক্রে আটকে রাখাটাই মূল কৌশল। একটা ঋণ শোধ করতে আরেকটা ঋণ নিতে হবে, এভাবেই চলবে।
রাজশাহীর বাউসা গ্রামে সাড়ে ৬০০ পরিবারের মধ্যে সাড়ে ৪০০ পরিবার ঋণগ্রস্ত। এই একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট বোঝার জন্য যে মাইক্রোক্রেডিট কোনো সমাধান নয়, বরং এটা একটা রোগ যা পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে। আর এই রোগের জীবাণু বহনকারীই এখন দেশের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে সহিংসতার মাধ্যমে সরকার উৎখাত হয়েছে, তার পেছনে যে বিদেশি অর্থায়ন ছিল, তা এখন আর গোপন নেই। আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এনজিওদের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তার করে আসছিল, তারাই এই পরিবর্তনের পেছনে। ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো মাঠে দাঙ্গা করেছে, সামরিক বাহিনী সমর্থন দিয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত মাইক্রোক্রেডিট ব্যবসায়ীকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।
এখন রাশিদুল ইসলাম চায়ের দোকানে বসে বলছেন, “একুনো চলতিচি। আমি যেকোনো জাগাত যাব, আমি নিজেই জানিনি।” এই বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের যন্ত্রণা। যারা জানে না তারা কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে। যাদের সাপ্তাহিক কিস্তি ১১ হাজার টাকা, কিন্তু আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস নেই।
বেলায়েত প্রামাণিক যখন বলেন, “যট্টুক জুগাড় হচ্ছে তট্টুকই দিচ্ছি,” তখন বোঝা যায় যে এই মানুষগুলো আসলে দাস। তারা কিস্তির দাস, এনজিওর দাস, একটা ব্যবস্থার দাস যেখান থেকে মুক্তি নেই।
আকবর হোসেন পানবরজে গলায় ফাঁস দিয়েছেন কারণ পানের দাম পাননি, কিন্তু ৪ লাখ টাকার ঋণের কিস্তি বন্ধ হয়নি। শামসুদ্দিন সুইসাইড নোটে লিখেছেন, “সুদ দিও না, কিস্তি দিও না।” মিনারুল ইসলাম ঋণের টাকা জুয়ায় শেষ করে নিজের স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন। এই মৃত্যুগুলো শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এগুলো একটা পচা ব্যবস্থার ফসল।
আর সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন বলছেন, তারা কোনো অভিযোগ পাননি। মানুষ মরে যাচ্ছে, বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, কিন্তু সরকারি অফিসে অভিযোগ আসছে না। এটাই তো স্বাভাবিক। যে দেশে সুদখোর মহাজন প্রধান উপদেষ্টা, সেখানে ঋণগ্রস্তদের অভিযোগ কার কাছে যাবে?
এই যে পুরো ব্যবস্থা, এটা তৈরি হয়েছে দশকের পর দশক ধরে। এনজিও সংস্কৃতি বাংলাদেশে এতটাই শক্তিশালী হয়ে গেছে যে রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব এখন এনজিওরা পালন করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সর্বত্র এনজিও। আর সব এনজিওর মূল কাজ হলো ঋণ দেওয়া। দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করার নামে আসলে তাদের চিরকালের জন্য ঋণের দাস বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।
ইউনুসের তত্ত্ব ছিল, দরিদ্রদের জামানত ছাড়া ঋণ দিলে তারা উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ মানুষ ঋণ নিয়ে লোকসান গুনছে, আর সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে আরও ঋণ নিচ্ছে। এটা একটা দুষ্টচক্র। আর এই দুষ্টচক্রের স্রষ্টাই এখন দেশ চালাচ্ছেন।
যে সামরিক বাহিনী এই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে, তারা জানত তারা কী করছে। যে ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমেছিল, তারা জানত তারা কার হয়ে কাজ করছে। যে বিদেশি শক্তি অর্থায়ন করেছে, তারা জানত তারা কাকে ক্ষমতায় বসাচ্ছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র যার শিকার সাধারণ মানুষ।
রাজশাহীর গ্রামগুলোতে এখন যা ঘটছে, সেটা শুধু রাজশাহীর সমস্যা নয়। এটা পুরো দেশের ভবিষ্যৎ। যখন একজন সুদখোর দেশ চালায়, তখন দেশের মানুষ সুদের জালে আটকা পড়বেই। এটা অনিবার্য। আর যতদিন এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন মীর রুহুল আমিনের মতো আরও অনেকে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেবে, শামসুদ্দিনের মতো আরও অনেকে ফাঁসিতে ঝুলবে, মিনারুল ইসলামের মতো আরও অনেকে পরিবার নিয়ে মরবে।

