বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাতে ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে দল না পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। একদিকে যেখানে বাংলাদেশি আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ নির্বিঘ্নে ভারতে একের পর এক ম্যাচে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, সেখানে হঠাৎ করে জাতীয় দলের জন্য ভারতকে ‘অনিরাপদ’ ঘোষণা করার পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে, তা আর ঢাকা থাকছে না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশজুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মূলে ছিল সুপরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্র। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার জন্য বিদেশি অর্থায়নে, দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের মাঠপর্যায়ের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রত্যক্ষ সমর্থনে সেই অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। ক্ষমতায় এসেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস, যাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে বহু বিতর্ক রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামিক উগ্রবাদী সংগঠন, যাদের অনেকেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়াটা মোটেই আকস্মিক নয়। যেসব ইসলামি দল এবং সংগঠন এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করে আছে, তাদের কাছে ভারত চিরকালই শত্রু। কারণটা খুবই পরিষ্কার। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত যে সমর্থন দিয়েছিল, যে সহায়তা করেছিল, তা এই গোষ্ঠীগুলো কখনোই মেনে নিতে পারেনি। তাদের আনুগত্য ছিল পাকিস্তানের প্রতি, এখনো আছে। পাকিস্তানকে তারা যেভাবে দেখে, সেই মানসিকতা থেকে তারা কখনোই বেরোতে পারেনি। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মে ভারতের ভূমিকাকে তারা ক্ষমা করতে পারে না, বরং সেটাকে তারা একটা অপরাধ বলেই মনে করে।
এই মানসিকতা থেকেই ভারতবিরোধী নানা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ক্রিকেট দল না পাঠানোর সিদ্ধান্তও সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হোক, দেশের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ভারতবিরোধী একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এই হীনমন্যতা আর প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না, বরং আরও পিছিয়ে দেওয়া হয়।
শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ যখন ভারতে একের পর এক ম্যাচে আম্পায়ারিং করছেন, কোনো ধরনের নিরাপত্তা সমস্যার মুখে পড়ছেন না, তখন এই ‘নিরাপত্তা শঙ্কা’র বিষয়টা কতটা সত্য তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলও এই বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে। কিন্তু বিসিবি তাতে কর্ণপাত করছে না। কারণ এই সিদ্ধান্তের মূলে যে রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে, তা ক্রীড়া যুক্তি দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সহযোগী শক্তিগুলো যেভাবে ক্ষমতায় এসেছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে গভীর। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারকে সহিংসতার মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করার ঘটনা সভ্য বিশ্বে গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই ক্ষমতা দখলে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য জেহাদি সংগঠনের যে ভূমিকা ছিল, তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের জন্য এক বিরাট হুমকি। যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন এবং তাদের ক্ষমতায়ন একটি জাতির জন্য কলঙ্কজনক।
এই সরকারের অধীনে যে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার প্রতিটিতেই একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা, এবং একটি বিশেষ মতাদর্শকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ভারতবিরোধিতা তার একটা অংশ মাত্র। পাকিস্তানের প্রতি যে অদ্ভুত দুর্বলতা এবং আনুগত্য এই গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে, তা থেকেই এই নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। একাত্তরে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের মানসিকতা আজও একই রয়েছে।
ক্রিকেটের মতো একটি খেলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কাছে দেশের স্বার্থ, ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি, বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোনোটাই অগ্রাধিকার নয়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেদের আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা, যতই তার মূল্য দিতে হোক দেশকে।
এই পরিস্থিতি শুধু ক্রিকেটের জন্যই নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। একটি দেশ যখন তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতা পালন করতে শুরু করে, যখন আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, যখন অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো নীতি চালায়, তখন সেই দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যায়।

