কুড়িগ্রামের শূন্যরেখায় দরবেশ কছিমুদ্দিনের মাজার। দুইশ’ বছরের পুরনো এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, যেখানে প্রতিবছর দুই দেশের মানুষ একসাথে মিলিত হতো। কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়েও যেখানে বিশ্বাস আর ভালোবাসার বন্ধন টিকে ছিল, সেখানে এবার নেমে এসেছে অন্ধকার। পঁচাত্তর বছর বয়সী জসিম উদ্দিন যখন বলেন, “ছোট থেকেই প্রতিবছর দরবেশ কছিমুদ্দিনের মাজার জিয়ারত করে আসছি”, তখন বোঝা যায় এটা শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটা প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি, পরিচয় আর বিশ্বাসের অংশ।
কিন্তু এবার বিশ হাজার বাংলাদেশি ভক্ত শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে পেরেছেন তাদের পূর্বপুরুষদের পবিত্র স্থানের দিকে। যে স্থান একসময় ছিল মিলনমেলা, সেখানে এখন শুধুই নিষেধাজ্ঞা আর হতাশা। সত্তর বছর বয়সী আব্দুল জব্বার যখন বলেন তার মানত পূরণ না হওয়ার কষ্টের কথা, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটা বাস্তবতা। জুলাই মাসের সেই অস্থিরতার পর থেকে যে অবৈধ সরকার ক্ষমতা দখল করে বসে আছে, তাদের হাতে দেশের পররাষ্ট্র নীতি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত।
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই অস্থায়ী সরকার, যারা নির্বাচিত নয়, যাদের কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, তারা ভারতের সাথে সম্পর্ক এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অধিকার পর্যন্ত বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ যাদের সাথে তারা হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই জামায়াতে ইসলামী আর অন্যান্য উগ্রবাদী ইসলামি সংগঠনগুলোর তো এটাই লক্ষ্য ছিল। বাংলাদেশকে একটা বিচ্ছিন্ন, আঞ্চলিকভাবে নিঃসঙ্গ দেশে পরিণত করা, যেখানে তারা তাদের বিদেশী প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।
এই ইউনুস সরকার আর তার জামাতি মিত্ররা যে বিদেশী শক্তির অর্থ আর ইসলামি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছে, সেটা আর গোপন কিছু নয়। তারা এই দেশে যে ধরনের ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা বাংলার মাটির ইসলাম নয়। এটা সৌদি আরবের মরুভূমি থেকে আমদানি করা ওহাবি মতবাদ, যার সাথে এই অঞ্চলের সুফি ঐতিহ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। দরবেশ কছিমুদ্দিনের মতো সুফি সাধকদের মাজার, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ শান্তি খুঁজে এসেছে, সেগুলো তো ওহাবি মতবাদে নিষিদ্ধ। কিন্তু জামায়াত আর তাদের মিত্ররা এখন এমন একটা অবস্থা তৈরি করেছে যেখানে এই মাজারগুলো অবহেলিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ওহাবিবাদ এই অঞ্চলের স্থানীয় কোনো আদর্শ নয়। বাংলাদেশের ইসলাম সবসময়ই ছিল উদার, সহিষ্ণু, সুফি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। শাহ জালাল, খানজাহান আলী, বায়েজিদ বোস্তামী থেকে শুরু করে লালন ফকির পর্যন্ত, এই মাটির আধ্যাত্মিকতা ছিল প্রেম আর সম্প্রীতির বার্তা বহনকারী। কিন্তু গত কয়েক দশকে সৌদি অর্থায়নে এই অঞ্চলে যে ধরনের ইসলাম রপ্তানি করা হয়েছে, সেটা একদমই আলাদা। এটা কঠোর, অসহিষ্ণু, বিভেদকামী। আর জামায়াত আর তাদের সহযোগীরা এই বিদেশী মতবাদকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা জানে, এই কট্টর মতবাদ ছড়িয়ে দিতে পারলে সমাজে বিভাজন তৈরি হবে, আর সেই বিভাজিত সমাজে তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে তো কথাই নেই। পৃথিবীর কোথাও এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে না যেখানে একটা ছোট দেশ তার সবচেয়ে বড় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক খারাপ করে উন্নতি করেছে। ভূরাজনীতির সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা হলো, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা। বিশেষ করে যখন সেই প্রতিবেশী আপনার দেশকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে, যখন আপনার বাণিজ্যের বিশাল অংশ তাদের সাথে, যখন আপনার নদী তাদের দেশ থেকে আসছে। কিন্তু ইউনুস আর তার জামাতি বন্ধুরা কি এসব ভাবে? তারা তো বিদেশী প্রভুদের স্বার্থে কাজ করছে, বাংলাদেশের স্বার্থে নয়।
এখন দেখুন কি হচ্ছে। একদিকে আফগানিস্তান, অন্যদিকে পাকিস্তান। এই দুই দেশের অবস্থা তো আমাদের চোখের সামনে। কট্টরবাদী ইসলামি শক্তি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন কি হয় সেটা তো এই দুই দেশ দেখিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। আফগানিস্তানে তালেবান মেয়েদের স্কুলে যেতে দেয় না, পাকিস্তানে প্রতিদিন বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে। আর বাংলাদেশ? আমরা কি সেই পথেই হাঁটছি না? ইউনুস আর জামায়াত যে দিকে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তো এটাই ভবিষ্যৎ। এই দেশ যেখানে একসময় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সবাই একসাথে বসবাস করতো, যেখানে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা, বড়দিন সব উৎসবই ছিল সবার, সেই দেশকে তারা বানাতে চাইছে একটা অসহিষ্ণু, বিচ্ছিন্ন, পশ্চাদপদ রাষ্ট্র।
আর মাঝখানে দুই দেশের সাধারণ মানুষ, যারা শুধু তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে চায়, তারা হয়ে যাচ্ছে এই রাজনৈতিক খেলার শিকার। পঁয়ষট্টি বছর বয়সী মনিরুজ্জামান সরকার যখন বলেন, “প্রতিবছর মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি ভারতের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হতো, উপহার আদান-প্রদান চলত”, তখন বোঝা যায় এটা শুধু ধর্মীয় বিষয় ছিল না, এটা ছিল মানবিক সম্পর্কের বন্ধন। কাঁটাতারের বেড়া তো ভূমি ভাগ করতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয় ভাগ করতে পারে না। কিন্তু এই অবৈধ সরকার আর তাদের উগ্রবাদী মিত্ররা সেই হৃদয়ের বন্ধনও ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে।
ভারতের দিক থেকে মাজার জিয়ারত কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল যখন বলেন, “বাংলাদেশি ভক্তরা না আসায় আমাদেরও খুব খারাপ লেগেছে”, তখন বোঝা যায় সীমান্তের ওপারেও মানুষ একই রকম কষ্ট পাচ্ছে। এই মাজার ছিল দুই দেশের মানুষের মধ্যে একটা সংযোগ সেতু, যেটা এখন ভেঙে যাচ্ছে ইউনুস সরকারের অদূরদর্শী আর বিদেশী স্বার্থের দাস নীতির কারণে।
যে সেনাবাহিনীর অংশবিশেষ এই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে, তারাও এখন এই পরিস্থিতির অংশীদার। একটা নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাত করে, জনগণের রায়কে অস্বীকার করে, জামায়াতের মতো যুদ্ধাপরাধী সংগঠনকে ক্ষমতার অংশীদার বানিয়ে তারা দেশকে যে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, এটা তার একটা প্রমাণ মাত্র। আরও বড় বিপর্যয় হয়তো সামনে অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস সবসময়ই ছিল সংগ্রাম আর স্বাধীনতার ইতিহাস। একাত্তরে এই দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছিল, কারণ তারা চেয়েছিল একটা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, উদার দেশ। কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায়, তারা সেই স্বপ্নকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। তারা এই দেশকে বানাতে চাইছে একটা ধর্মীয় উগ্রবাদের আখড়া, যেখানে বিদেশী মতবাদ আর স্বার্থই হবে প্রধান, বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য হবে পদদলিত।
কুড়িগ্রামের শূন্যরেখায় যে মাজার থেকে হতাশ মানুষগুলো ফিরে এলো, তারা শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত হয়নি। তারা বঞ্চিত হয়েছে তাদের ঐতিহ্য থেকে, তাদের স্মৃতি থেকে, তাদের পরিচয়ের একটা অংশ থেকে। আর এর দায় সম্পূর্ণভাবে বর্তায় ইউনুস, জামায়াত আর তাদের বিদেশী প্রভুদের ওপর, যারা নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থের জন্য এই দেশের মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারও কেড়ে নিতে পিছপা হচ্ছে না।

