বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাকশিল্প আজ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি কমছে, প্রধান বাজারগুলো হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাঁধিয়ে যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের অযোগ্য হাতে দেশের সবচেয়ে বড় আয়ের খাতটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার যে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তার মাশুল দিতে হচ্ছে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ কাহিনী। জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১১ শতাংশেরও বেশি, ফ্রান্সে প্রায় ১১ শতাংশ। ক্রোয়েশিয়ায় পতন হয়েছে ৭৭ শতাংশ। রোমানিয়ায় ৩৫ শতাংশ, স্লোভেকিয়ায় প্রায় ২৩ শতাংশ। এই তালিকা দীর্ঘ এবং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। এমনকি রাশিয়া, তুরস্ক, মেক্সিকো, ভারত, অস্ট্রেলিয়ার মতো অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও বাংলাদেশ আগ্রহ হারাচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের দায় কার? ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল, সেই অপরাধীদের। বিদেশি শক্তির অর্থায়নে, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে যে দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল, তার ফলাফল আজ পুরো দেশ ভোগ করছে। মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি নোবেল পুরস্কারের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন, তার অবৈধ সরকার গত ছয় মাসে পোশাকশিল্প রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
ইউনুস এবং তার দলবল যখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মত্ত, যখন তারা বিরোধী মতাবলম্বীদের দমন করতে ব্যস্ত, তখন দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ছে প্রতিদিন। পোশাকশিল্পে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার ছিল, যে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে, তার সবকিছুই ধ্বংস করে দিয়েছে এই অবৈধ শাসকগোষ্ঠী। একটি দেশে যখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়, যখন রাস্তায় রক্ত ঝরে, যখন কারখানায় অগ্নিসংযোগ হয়, তখন কোন আন্তর্জাতিক ক্রেতা সেখানে অর্ডার দিতে আগ্রহী হবে?
পোশাকশিল্পের সংকটের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকে বৈশ্বিক মন্দার কথা বলছেন, বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো কি একই অবস্থায় আছে? ভিয়েতনাম কি এভাবে রপ্তানি হারাচ্ছে? চীন, ভারত, কম্বোডিয়া কি একই হারে পতন দেখছে? উত্তর হলো না। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বৈশ্বিক মন্দা নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট দেশীয় সংকট যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একটি অবৈধ সরকারের অযোগ্যতা।
ইউনুস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা ও মালিকদের সাথে কোনো কার্যকর সংলাপ হয়নি। তাদের সমস্যাগুলো বোঝার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকিং ব্যবস্থার অচলাবস্থা, ডলার সংকট থেকে শুরু করে সব ধরনের সমস্যা এখন চরমে। কিন্তু সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই। তারা ব্যস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে, নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে।
বিদেশি ক্রেতারা এখন বাংলাদেশকে দেখছে একটি অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে। জুলাইয়ের দাঙ্গা, নির্বাচিত সরকারের পতন, সামরিক হস্তক্ষেপ, জঙ্গি তৎপরতার খবর পৌঁছেছে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। কোন কোম্পানি এমন একটি দেশে বিনিয়োগ করবে যেখানে আজ সরকার আছে, কাল থাকবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই? কোন ক্রেতা এমন একটি দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে চাইবে যেখানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রতিনিয়ত?
ইউনুস নিজে একজন অর্থনীতিবিদ বলে পরিচয় দেন, মাইক্রোক্রেডিটের জনক বলে নিজেকে জাহির করেন। কিন্তু তার এই তথাকথিত অর্থনৈতিক জ্ঞান কোথায় যখন দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প ধসে পড়ছে তার চোখের সামনে? গ্রামীণ ব্যাংক চালিয়ে সুদের ব্যবসা করা আর একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। সুদী মহাজনি ব্যবসা করে যে অভিজ্ঞতা, তা দিয়ে কখনো একটি দেশ চলে না। পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিকদের সমস্যা বোঝার জন্য যে দূরদর্শিতা দরকার, যে সংবেদনশীলতা প্রয়োজন, তার কোনোটাই নেই এই অবৈধ সরকারের কাছে।
লাখ লাখ শ্রমিক আজ তাদের চাকরি হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। কারখানাগুলো অর্ডার না পেয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। যে পরিবারগুলো পোশাকশিল্পের আয়ে নির্ভরশীল, তাদের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু ইউনুস এবং তার সহযোগীরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তারা ব্যস্ত ক্ষমতার খেলায়, রাজনৈতিক হিসেব নিকেশে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। একটি বৈধ, নির্বাচিত সরকার ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, পোশাকশিল্পের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান দরকার। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সচল করতে হবে, ডলার সংকট নিরসন করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে। কিন্তু এসব কিছুই সম্ভব নয় যতদিন একটি অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে।
ইউনুস এবং তার সরকার যত তাড়াতাড়ি ক্ষমতা ছাড়বে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল। তারা যে অপরাধ করেছে, যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তার বিচার হওয়া উচিত। জুলাইয়ের দাঙ্গায় যারা প্রাণ দিয়েছে, যারা আহত হয়েছে, তাদের পরিবারের কাছে জবাবদিহি করা উচিত এই অবৈধ শাসকদের। পোশাকশিল্পের ধ্বংসযজ্ঞের জন্য তাদের দায়ী করা উচিত।
বাংলাদেশের মানুষ এই অবৈধ শাসন মেনে নেয়নি, মেনে নেবে না। দেশের অর্থনীতি যখন ধসে পড়ছে, যখন লাখ লাখ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে, তখন এই অযোগ্য সরকারের কোনো নৈতিক অধিকার নেই ক্ষমতায় থাকার। ইতিহাস এদের ক্ষমা করবে না। বাংলাদেশের মানুষও ভুলবে না কারা তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, কারা তাদের জীবিকা কেড়ে নিয়েছে।
পোশাকশিল্পের এই সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অপরাধের ফলাফল। যারা বিদেশি অর্থে, জঙ্গিদের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর মদদে ক্ষমতা দখল করেছে, তারাই এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। ইউনুস এবং তার তথাকথিত সরকারের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। তাদের যত দ্রুত ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে, ততই দেশের মঙ্গল।

