বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে হতে যাচ্ছে, যা এর গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এই নির্বাচনটি একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। বরং পদ্ধতিগতভাবে ভঙ্গুর এবং রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—স্পষ্ট আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতি, প্রধান রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের একটি বড় অংশের কার্যকর বর্জন, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
এই নির্বাচনটি কোনো সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ম্যান্ডেট বা সংসদীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা একটি গুরুতর আইনি শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে, প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কার্যকর অনুপস্থিতির ফলে আনুমানিক ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা নির্বাচনের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রকে মৌলিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই কাঠামোগত ত্রুটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি অরাজক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, প্রার্থীদের ভীতি প্রদর্শন এবং পক্ষপাতমূলক আইন প্রয়োগের ঘটনা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব এবং নির্বাচনী বিধিমালার অসম প্রয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ জনআস্থাকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততাও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক এবং গণমাধ্যমের জন্য ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এরমাধ্যমে একটি গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী মহড়াকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৈরি হওয়াএকটি অমীমাংসিত রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীন প্রশাসন দেশকে স্থিতিশীল করা, প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার এবং একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের তথাকথিত ‘তত্ত্বাবধায়ক’ চরিত্র খারাপের দিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রশাসন, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। অথচ এসব সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের অধীনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ঐক্যমত ছাড়াই এবং অংশগ্রহণ ও নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না করেই গৃহীত হয়েছে। সমালোচকদের মতে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আগে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের মূল যুক্তিকে কার্যত উল্টে দিয়েছে।
গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের একটি নিরপেক্ষ সেতু হিসেবে কাজ করার বদলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্রমশ একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রহসনকারীর ভূমিকার অবতীর্ণ হয়েছে । এই অবস্থান নির্বাচনী পরিবেশকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে, যা আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্দেহ আরও গভীর করে তুলছে।
নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্তকারী পদ্ধতিগত ব্যর্থতাসমূহ
একাধিক কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা সম্মিলিতভাবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পুরো প্রক্রিয়াটি কোনো সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ভিত্তি ছাড়াই রাজনৈতিক বর্জন, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে আইনি বৈধতা দুর্বল হয়েছে, প্রকৃত নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়েছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য ন্যূনতম শর্তগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি সংসদীয় অনুমোদন বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার দ্বারা সমর্থিত কোনো সুস্পষ্ট সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ কাঠামো ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচনের সময়সীমা, অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বসহ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মূল উপাদানগুলো প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক পদ্ধতির পরিবর্তে নির্বাহী আদেশ ও রাজনৈতিক নির্দেশনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমান কাঠামোটি কোনো সর্বজনগ্রাহ্য আইনি ম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, এমনকি এর পেছনে কোনো ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্যও গড়ে ওঠেনি। একটি সুসংহত সাংবিধানিক পথনির্দেশের এই অনুপস্থিতি আইনি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতাকে মৌলিকভাবে দুর্বল করে তুলেছে।
প্রধান রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের বর্জন
এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কার্যকর অনুপস্থিতির মধ্যেই এগোচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশের ঐতিহাসিকভাবে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, যা স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। দলটি দেশজুড়ে বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো ও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
এছাড়াও, একাধিক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বা কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের ভোটার আচরণ ও রাজনৈতিক সমর্থনের ধারা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, প্রধান দলগুলোর অনুপস্থিতিতে ভোটারদের একটি বিশাল অংশ সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এর ফলে এই নির্বাচনের প্রতিনিধিত্বমূলক বৈধতা গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ
সাংবিধানিকভাবে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করার প্রত্যাশা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের সম্মুখীন হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ‘সিলেক্টিভ গভর্নেন্স’ বা বেছে বেছে প্রশাসন নিয়োগ, আইনের অসম ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে, যা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিচ্ছে এবং অন্যদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
নির্বাহী ক্ষমতার কয়েকজন ব্যক্তি ওপর নির্ভর হওয়ায় এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, এই সরকার নিরপেক্ষ নেই। এর ফলে তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনগণের আস্থা হারিয়েছে।
একতরফা নির্বাচনের আতঙ্ক
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জন এবং ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশ এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে যে, আসন্ন নির্বাচনটির ফলাফল কার্যত একতরফা হয়ে উঠতে পারে। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রকৃত প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত থাকলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া একটি অর্থবহ গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে কেবল আনুষ্ঠানিক বা নামমাত্র প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পার ।
ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতা
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদি ঢাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনাটি দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক অস্থিরতা, বিক্ষোভ এবং উত্তেজনার জন্ম দেয়।
হাদির ওপর এই হামলা নির্বাচনের আগে অরাজক রাজনৈতিক পরিবেশকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
সহিংসতা ও হতাহতের আশঙ্কাজনক মাত্রা
হাদির মৃত্যুর মতো আলোচিত ঘটনার বাইরেও নির্বাচনের আগের সময়গুলোতে দেশব্যাপী একাধিক সহিংস ঘটনার নজির পাওয়া গেছে। ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একজন বিশিষ্ট নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের টার্গেট করে হামলার আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে।
এছাড়াও যশোরে চলন্ত গাড়ি থেকে চালানো গুলিতে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন নিহত হন, যা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; বরং তা আঞ্চলিক পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। একই সময়ে, ঢাকায় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর এক নেতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনা রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসর ও জটিলতা সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের একাধিক জেলায় চলমান সংঘর্ষ, গুলি বিনিময় এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিক চিত্র উঠে আসছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রচারণা এবং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতাকে ঘিরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। বারবার হওয়া এসব ঘটনা ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনীতি-কেন্দ্রিক সহিংস পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব ঘটনা রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক উভয়কেই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতি একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময়সীমা শুরু হওয়ার আগেই হুমকি, হামলা ও জবরদস্তির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা প্রার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। চট্টগ্রামে নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসময় তার একাধিক সমর্থক আহত হন। এসব ঘটনা থেকে প্রার্থীদের জন্য মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।
এই ধরনের হামলার ফলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা জনসমক্ষে তাদের উপস্থিতি সীমিত করে দিচ্ছেন। এর ফলে একটি ভীতিপ্রদ পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সমান অংশগ্রহণের মৌলিক নীতিকে ক্ষুণ্ণ করছে।
এই সীমাবদ্ধ ও অনিরাপদ রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদীয় প্রার্থীপদ গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের একটি উপায়ে পরিণত হচ্ছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বৈধতা বা প্রকৃত জনসমর্থন থাকুক বা না থাকুক বিপুল সংখ্যক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যখন সংসদীয় পদ জনআস্থার বাহক না হয়ে ক্ষমতা ও সম্ভাব্য দায়মুক্তির উৎসে পরিণত হয়, তখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মৌলিক চরিত্রই বিকৃত হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে সরাসরি ও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ঢালাওভাবে বাতিল
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটিও ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, যার অনেকগুলোই সামান্য নথিপত্র বা হলফনামা সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে একই ধরনের ত্রুটির ক্ষেত্রে জেলাভেদে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটির সামঞ্জস্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যদিও আপিলের সুযোগ বিদ্যমান, তবু এই ব্যাপক প্রার্থিতা বাতিলের ফলে প্রার্থীদের বিকল্প সংকুচিত হয়েছে এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। এর পরিণতিতে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনআস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুর্বল ও পক্ষপাতমূলক আইন প্রয়োগ
নিরাপত্তা জোরদারের সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শন কার্যত অব্যাহত রয়েছে। এর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না। গুলিবর্ষণসহ রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে বা অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে। খুব কম ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। এই প্রবণতা পক্ষপাতমূলক আইন প্রয়োগের অভিযোগকে আরও জোরালো করছে। নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রের নিরপেক্ষভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন
এই আইনি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতাগুলো সম্মিলিতভাবে এমন একটি চক্র সৃষ্টি করেছে, যা নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ হওয়ার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে বাধা দিচ্ছে। ঘোষিত যৌথ অভিযান ও নিরাপত্তা বাহিনির উদ্যোগগুলো বাস্তবে সহিংসতা নিরসন বা ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে না। বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতিই আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
প্রার্থীদের আচরণে নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার ক্ষতি
নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর উস্কানিমূলক ও বিভাজনমূলক বক্তব্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থাকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে। গঠনমূলক নীতি-ভিত্তিক বিতর্কের পরিবর্তে কিছু এলাকায় জনবক্তৃতা উস্কানি ও বিরোধিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি সামাজিক বিভাজন তীব্রতর করছে এবং নির্বাচনের প্রতি আস্থাকে সংকুচিত করছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন
আগাম প্রচারণা, প্রশাসনিক বা সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ নির্বাচনী আচরণবিধির অসংখ্য লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী নিয়মনীতির এই অসম প্রয়োগ নিরপেক্ষতা ও নিয়মভিত্তিক নির্বাচনী শাসন বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পছন্দ রক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত হবে না বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানো। তা করা হলে এমন একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বৈধতা দেওয়া হবে, যাতে লাখ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে স্তব্ধ করা হয়েছে এবং সহিংসতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষণ মানে গণতন্ত্র রক্ষা করা নয়; বরং তার অবক্ষয়কে বৈধতা দেওয়া।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তিসহ (আইসিসিপিআর) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে এমন নির্বাচন আয়োজনের বাধ্য। সাংবিধানিক বৈধতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও নিরাপত্তা ছাড়া পরিচালিত কোনো নির্বাচন এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না।
এই সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক নীরবতা বা আগাম সমর্থন বাংলাদেশের জনগণকে কার্যত পরিত্যাগ করার শামিল। এখন পরিস্থিতিতে বর্তমান ভোট প্রক্রিয়া স্থগিত করতে হবে, একটি বৈধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী কাঠামো দাঁড় করাতে হবে এবং একটি প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র চায় কোনো প্রতীকী আয়োজন নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো জনগণের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধকারী কোনো প্রক্রিয়াকে বৈধতা না দেওয়া।
এই পরিস্থিতির অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই গণতান্ত্রিক বৈধতা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বরং তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।

