রংপুরে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার মুখ থেকে যে বক্তব্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতই নয়, বরং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে স্পষ্ট বেয়াদবি। এটিএম আজম খান নামের এই ব্যক্তি দাবি করছেন যে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির চেয়েও তার দলীয় ত্যাগ বড়। এই কথাটি যে কতটা গুরুতর, তা বুঝতে হলে ইসলামের ইতিহাস এবং তাওহিদের মূল ভিত্তি সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকাই যথেষ্ট।
হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানি ছিল আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের এক অতুলনীয় প্রকাশ। নিজের সন্তানকে আল্লাহর হুকুমে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরকালীন এক শিক্ষা, যেখানে মানুষ বুঝতে পারে যে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির সামনে দুনিয়ার সব কিছু তুচ্ছ। কিন্তু রংপুরের এই জামায়াত নেতা সেই পবিত্র ঘটনাকে টেনে এনে নিজের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করছেন। তিনি বলছেন, তার দলের জন্য একটি আসন ছেড়ে দেওয়া ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির চেয়েও মহান। এই ধরনের কথা কি তাহলে কুফরি নয়? ইসলামের নবীদের মর্যাদাকে হেয় করে নিজের দলীয় স্বার্থকে বড় করে দেখানো কি ইসলামের শিক্ষা?
যে দলটি দশকের পর দশক ধরে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে রাজনীতি করে আসছে, সেই জামায়াতে ইসলামীর আসল চেহারা এখন আর কারও কাছে অজানা নেই। এরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, নারী নির্যাতনে সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে নানা কৌশলে তারা নিজেদের অতীতকে ধামাচাপা দিয়ে আবার রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে জামায়াত এবং তাদের সহযোগী শক্তিগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পুরো প্রক্রিয়ায় এই জামায়াতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে দল একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল, তারা কীভাবে ইসলামের ধারক-বাহক হতে পারে? যে দল ক্ষমতার লোভে নারী নির্যাতন, হত্যা, নৃশংসতায় লিপ্ত ছিল, তারা কীভাবে নবী-রাসুলদের কোরবানির সঙ্গে নিজেদের তুলনা করার সাহস পায়? এটাই হচ্ছে মুনাফেকির চরম নমুনা। ধর্মের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা, আর তারপর সেই ধর্মের মৌলিক শিক্ষাকেই অবমাননা করা।
আজম খান তার বক্তব্যে দাবি করেছেন যে কেন্দ্র থেকে তাকে ফোন করে বলা হয়েছে তার কোরবানি ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের চেয়েও বড়। যদি সত্যিই কেউ এমন কথা বলে থাকে, তাহলে সেটা আরও ভয়াবহ। এর মানে দাঁড়ায় যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও এই ধরনের বিকৃত চিন্তায় আক্রান্ত। তারা নিজেদের দলীয় স্বার্থকে এতটাই বড় করে দেখে যে ইসলামের পবিত্রতম ঘটনাগুলোকেও তুচ্ছ মনে করতে দ্বিধা করে না। এই হচ্ছে সেই দলের আসল চরিত্র, যারা মুখে ইসলামের কথা বলে কিন্তু কাজে ইসলামের শিক্ষাকে পদদলিত করে।
আরও মজার ব্যাপার হলো, এই ভিডিও যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে, তখন হয়তো দেখা যাবে আজম খান লাইভে এসে বলবেন এটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটাই তো এদের চিরাচরিত কৌশল। যখন ধরা পড়ে যায়, তখন হয় অস্বীকার করো, নয়তো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করো। কিন্তু ভিডিওতে যে মানুষটি কথা বলছেন, তার কণ্ঠস্বর, তার উপস্থিতি, সবকিছুই পরিষ্কার। এটা কোনো এআই জেনারেটেড ভিডিও নয়, এটা বাস্তব।
যে দেশে ২০২৪ সালে একটি সাজানো দাঙ্গার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা হয়েছে, যেখানে বিদেশি অর্থায়ন আর ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই দেশে এখন জামায়াত খোলাখুলিভাবে রাজনীতি করছে। তারা শুধু রাজনীতিই করছে না, বরং ইসলামের পবিত্র ইতিহাসকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটা একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণা, যেখানে ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি নিজেকে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন, তিনি কীভাবে এই পুরো পরিস্থিতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গ্রামীণ ব্যাংকের নামে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সুদের ব্যবসা করে যে ব্যক্তি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তিনিই আবার এখন দেশের অভিভাবক সেজে বসেছেন। এই ব্যক্তি এবং জামায়াত, দুজনেই একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে ইউনূস অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে জামায়াত ধর্মের নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।
এই যে নবী-রাসুলদের কোরবানির সঙ্গে দলীয় রাজনীতির তুলনা, এটা আসলে কতটা গভীর সংকটের লক্ষণ তা বোঝা দরকার। যখন একটি রাজনৈতিক দল ধর্মকে এতটা নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে, তখন বুঝতে হবে তাদের কাছে ধর্ম শুধুই একটি হাতিয়ার, বিশ্বাস নয়। তারা আল্লাহকে ভয় পায় না, বরং ক্ষমতাকে ভালোবাসে। তারা কোরআন-হাদিসের শিক্ষা মানে না, বরং দলীয় নির্দেশনা মানে। এরাই হচ্ছে সেই মুনাফেক, যাদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
এই দেশের সাধারণ মানুষ, যারা সত্যিকার অর্থে ধর্মপ্রাণ, তাদের কাছে এই ঘটনা একটি বড় চোখ খোলার সুযোগ। জামায়াত যে ইসলামের ধারক-বাহক নয়, বরং ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলকারী একটি রাজনৈতিক দল, সেটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। যারা একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা আবার ২০২৪ সালে নতুন করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য কখনও দেশের কল্যাণ ছিল না, এখনও নেই।
আজম খানের এই বক্তব্য শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা জামায়াতের পুরো মানসিকতার প্রতিফলন। তারা মনে করে ধর্মকে যেকোনোভাবে ব্যবহার করা যায়, যেকোনো কথা বলা যায়, যদি সেটা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করে। কিন্তু ইসলাম এত সস্তা নয়। ইসলামের ইতিহাস এত তুচ্ছ নয় যে যে কেউ এসে নিজের খেয়ালখুশিমতো তার সঙ্গে তুলনা করবে।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে যে ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে, তারা আসলে ধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু। জামায়াত এবং তাদের মিত্ররা যে খেলা খেলছে, সেটা দেশের জন্য, ইসলামের জন্য, এবং মানবতার জন্য চরম হুমকি। এই হুমকি মোকাবেলা করতে হবে সত্যের আলো দিয়ে, তথ্যের শক্তি দিয়ে। মানুষকে জানতে হবে কারা আসলে তাদের বন্ধু, আর কারা শত্রু।

