বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারীদের ‘দায়মুক্তি’ দেওয়ার সরকারি ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে জেল থেকে অভিযুক্তদের মুক্ত করার ঘটনাপ্রবাহ দেশকে এক নতুন আইনি ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে যেমন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই রয়েছে, তেমনি জড়িয়ে আছে জটিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি। অধ্যাপক ইউনূস ভোটের আগে এই জুলাই জঙ্গিদের দিয়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি করিয়ে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে লিখেছেন, “জুলাই যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছে। তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে।” সরকারের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা ‘মব জাস্টিস’ বা গণ-বিচারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে, বানিয়াচং থানায় অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ হত্যার সাথে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দেওয়া মাহদী হাসান এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে যে প্রক্রিয়ায় জেল থেকে বের করা হয়েছে, তাকে বিচার ব্যবস্থার ওপর ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, অপরাধের বিচার আদালতেই হওয়া উচিত; কিন্তু উগ্র জনতার চাপে অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
অভিযোগ উঠছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় আসন্ন নির্বাচন বানচালের মিশনে নেমেছে। সূত্রগুলো দাবি করছে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার তথাকথিত ‘জুলাই জঙ্গিদের’ উসকে দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে যাতে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ড. ইউনূসকে এই পরিকল্পনায় ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করছে পশ্চিমা শক্তি। বিনিময়ে তাকে জাতিসংঘ মহাসচিবের মতো বড় পদের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট। বিশেষ করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং মিয়ানমারে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের প্রভাব কমাতে বাংলাদেশে একটি অনুগত সরকার থাকা ওয়াশিংটনের জন্য জরুরি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা সেই শঙ্কা আবার সামনে আনছেন। পূর্ব তিমুরের মতো এখানেও কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা জাতিগত রাষ্ট্র গঠনের নীল নকশা বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও এ অঞ্চলে একটি বিদেশি এয়ার বেজ স্থাপনের প্রস্তাবও এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর পাকিস্তান-জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমন্বিত প্রচেষ্টাকে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে যদি একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। মব কালচার এবং অপরাধীদের ‘বিপ্লবী’ তকমা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের কবলে পড়বে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি। সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে অতি দ্রুত ‘মব জাস্টিস’ বন্ধ করতে হবে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে। অন্যথায়, বিদেশি শক্তির এই ক্রীড়নক হওয়ার মাশুল দীর্ঘকাল ধরে দিতে হতে পারে জাতিকে।

