একদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার পথ একে একে বন্ধ হয়ে আসছে, অন্যদিকে যে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় বসে আছে তারা এ নিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ তো দূরের কথা, ন্যূনতম উদ্বেগ পর্যন্ত প্রকাশ করছে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে রক্তাক্ত দাঙ্গা এবং সহিংসতার মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হয়েছিল, তার প্রভাব এখন সাধারণ মানুষ, বিশেষত শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে সরাসরি অ্যাসেসমেন্ট লেভেল ১ থেকে লেভেল ৩-এ নামিয়ে দিয়েছে। জার্মানির রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বলছেন বাংলাদেশিরা জাল কাগজপত্র জমা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার মানে এখন যে কোনো বাংলাদেশি আশ্রয় চাইলে তাকে সরাসরি ফেরত পাঠানো হবে। যুক্তরাজ্যের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালিতে ৬০ হাজার আবেদন ঝুলে আছে, মাল্টায় বাংলাদেশিদের ভিসা রিজেকশন হার ৬২ শতাংশের বেশি।
এই যে দেশের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে, এটা রাতারাতি হয়নি। জুলাইয়ের সেই পরিকল্পিত দাঙ্গা, যেখানে বিদেশি অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয়তা এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল, তার পর থেকেই বিশ্বের চোখে বাংলাদেশ একটি অস্থিতিশীল, অনিরাপদ এবং অবিশ্বাসযোগ্য দেশ হয়ে উঠেছে। যে দেশে সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা যায়, যেখানে আইনের শাসনের বদলে জনতার শাসন চলে, সেই দেশের নাগরিকদের বিশ্বাস করবে কেন অন্য দেশগুলো?
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন যে তথাকথিত সরকার এখন চলছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো তাদের সম্পূর্ণ উদাসীনতা। পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা শুধু বলেছেন, কোন দেশ কাকে ভিসা দেবে সেটা তাদের নিজস্ব এখতিয়ার। এটা কি কোনো জবাব হলো? দেশের লাখ লাখ তরুণের স্বপ্ন যখন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তখন সরকারের কাজ শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকা আর বলা যে অন্য দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত?
সমস্যাটা শুধু কাগজপত্রের জালিয়াতিতে সীমাবদ্ধ নেই, যদিও সেটাও একটা বাস্তবতা। আসল সমস্যা হলো দেশে এখন যে অবৈধ ক্ষমতাসীনরা বসে আছে, তাদের কোনো নৈতিক অধিকার নেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার। তারা নিজেরাই একটি সামরিক সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের হাতে দেশের কূটনীতি যখন চলে, তখন অন্য দেশগুলো কীভাবে আস্থা রাখবে? যে সরকারের নিজের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের ইশু করা কাগজপত্র বিশ্বাসযোগ্য হবে কেন?
অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি পরিষ্কার বার্তা। যখন একটি দেশকে লেভেল ১ থেকে সরাসরি লেভেল ৩-এ নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে ওই দেশের পরিস্থিতি কতটা খারাপ। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এখন আর্থিক সক্ষমতার কঠোর প্রমাণ দিতে হবে, ব্যাংক ট্রানজেকশন হিস্ট্রির হিসাব দিতে হবে, হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকা জমা হলে তার উৎস ব্যাখ্যা করতে হবে। এগুলো সবই হচ্ছে কারণ বাংলাদেশ এখন একটি অবিশ্বস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত।
ইউরোপের নিরাপদ দেশের তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশের। শুনতে ভালো লাগলেও এর অর্থ ভয়াবহ। এর মানে হলো, এখন থেকে কোনো বাংলাদেশি যদি স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চায়, তাহলে তার আবেদন সরাসরি ভিত্তিহীন বলে গণ্য হবে এবং তাকে দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এটা হয়েছে কারণ জুলাইয়ের পরে যে সরকার এসেছে, তাদের অধীনে দেশ নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যে সরকার নিজেই একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের অধীনে কারা নিরাপদ? শুধু তারাই নিরাপদ যারা ওই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সমর্থন দিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫ শতাংশ রিজেকশন সীমা এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চ রিজেকশন হার তাদের স্পন্সরশিপ লাইসেন্স হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে লন্ডন মেট্রোপলিটন, গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এটা শুধু ভিসা সমস্যা নয়, এটা জাতি হিসেবে আমাদের গ্রহণযোগ্যতার সংকট।
ইতালিতে ৬০ হাজার আবেদন ঝুলে আছে, মাল্টায় রিজেকশন হার ৬২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই যে একের পর এক দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এর দায় কার? যারা জুলাইয়ে দেশব্যাপী দাঙ্গা লাগিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে, যারা বিদেশি শক্তির টাকা আর জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে, তাদের। আর সবচেয়ে বড় দায় সেই সুদী মহাজন ইউনুস এবং তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদের, যারা কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় বসে আছে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
যে দেশের সরকারই অবৈধ, সেই দেশের জনগণের সাথে এর থেকে ভালো কিছু হওয়ার আশা করাটাই বোকামি। বিশ্বের কোনো দেশ একটি অবৈধ সরকারের নাগরিকদের বিশ্বাস করবে না, এটাই স্বাভাবিক। ইউনুস এবং তার দল যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু খারাপই হবে, ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যেতে চায়, উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। কিন্তু একটি অবৈধ সরকারের কারণে তাদের সেই স্বপ্ন চূর্ণ হচ্ছে। যখন অস্ট্রেলিয়ার ভিসা অফিসার বা জার্মানির রাষ্ট্রদূত বলেন বাংলাদেশিরা জাল কাগজ জমা দেয়, তখন শুধু কিছু অসৎ এজেন্টের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আসল সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন অবৈধতা, অসততা এবং ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতি চলে, তখন সেই দেশের প্রতিটি নাগরিক তার মাশুল দেয়।
ইউনুসের সরকার কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে না, কোনো লবিং করছে না, কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে না। শুধু উদাসীনভাবে বসে বসে দেখছে কীভাবে একের পর এক দেশ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সেই অসহায় বক্তব্য, ভিসা দেওয়া না দেওয়া অন্য দেশের এখতিয়ার, এটা কোনো সরকারের ভাষা হতে পারে না। এটা হলো পরাজিত, অক্ষম এবং অবৈধ একটি সরকারের ভাষা।

