ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। গত শুক্রবার কুমিল্লা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিজের প্রার্থিতা বৈধ হওয়ার পর হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, “বর্তমান প্রশাসন অনেকটা বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে।” তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন বিএনপি নেতা তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং জামায়াত নেতাদের গণহারে মনোনয়ন বাতিল নিয়ে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রশাসনের যে দ্বিচারিতামূলক আচরণ, তাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি।” জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম এই নেতার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রশাসন যে নির্মোহ আচরণ করার কথা ছিল, তার পরিবর্তে তারা একটি বিশেষ দলের প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও ক্ষমতার পালবদল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন। গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরার ঘটনাটি বিএনপির জন্য এক বিশাল উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ আওয়ামী লীগ আমলের সব গুরুতর অভিযোগ থেকে আদালত তাকে খালাস দিয়েছে। পাসপোর্ট জটিলতা নিরসন থেকে শুরু করে দ্রুততম সময়ে তাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিষয়গুলো সরকারের ‘বিশেষ সদিচ্ছা’ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অনেকের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার হয়তো তারেক রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথই প্রশস্ত করছে, যা প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়েও একটি সংকেত পাঠিয়ে দিয়েছে।
জামায়াতের মনোনয়ন বাতিল ও জোটের ফাটল
প্রশাসনের এই কথিত ‘বিএনপিপ্রীতি’র সবচেয়ে বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নের ক্ষেত্রে। বিএনপিকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে কৌশলে জামায়াত নেতাদের মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন উঠেছে।
কক্সবাজার-২: জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। কুমিল্লা-৩: হলফনামায় তথ্য অসম্পূর্ণ থাকার অজুহাতে বাতিল হয়েছে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন। গাইবান্ধা-১: জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করে বিএনপির পথ সহজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে জামায়াত ও এনসিপি রাজপথে সক্রিয় থাকলেও, নির্বাচনের মাঠে বিএনপির সাথে তাদের কৌশলগত দূরত্ব এখন স্পষ্ট। তারেক রহমান এককভাবে ক্ষমতা সংহত করলে জামায়াত বা এনসিপির মতো দলগুলো ক্ষমতার কতটা অংশীদার হতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তারা আগামী ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। তবে প্রচারণার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রার্থীরা আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় তারা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি এখন অনেকাংশেই তারেক রহমান ও বিএনপির অনুকূলে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।

