মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনামের হাতে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু মরেনি, খুন হয়েছে। এই দুই ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশের কাছে দেশের স্বার্থকে জিম্মি বানিয়ে ফেলেছিলেন এমন সময়ে যখন দেশটা দাঁড়িয়ে ছিল একটা গভীর সংকটের মুখে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের বিষোদগার এতটাই মরিয়া ছিল যে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটা কুখ্যাত সংগঠন, যাদের হাত রক্তে রঞ্জিত, তাদের অপরাধগুলো ধামাচাপা দিতে এই দুই সম্পাদক কোনো রকম দ্বিধা করেননি।
প্রথম আলো আর দ্য ডেইলি স্টার যখন মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশের ত্রাণকর্তা বানাতে ব্যস্ত, তখন তারা ভুলে গেছেন এই মানুষটি একজন সুদখোর ছাড়া আর কিছু নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের নামে দরিদ্র মানুষের ঘাড়ে সুদের বোঝা চাপিয়ে কোটি কোটি টাকা কামানো এই ব্যক্তিকে তারা সাজিয়েছেন মহান সমাজসেবক হিসেবে। ইউনূসের আন্তর্জাতিক লবি, তার পশ্চিমা প্রভুদের সাথে সখ্যতা, আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার ভূমিকা নিয়ে এই দুই পত্রিকায় কখনো কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। কারণটা পরিষ্কার। ইউনূস ছিলেন তাদের হাতিয়ার, শেখ হাসিনাকে টেনে নামানোর একটা মাধ্যম।
কিন্তু আসল ষড়যন্ত্রটা শুরু হয় যখন এই দুই পত্রিকা জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতাকে নিয়মিতভাবে আড়াল করতে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে যখন রাস্তায় লাখো মানুষ, তখন এই পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় ছিল যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ছাত্রশিবির যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে খুন করছে মুক্তচিন্তার ছাত্রদের, তখন এই পত্রিকার পাতায় সেসব খুনের খবর হয় পাতার শেষের দিকে ছাপা হতো, নয়তো একেবারেই উপেক্ষিত থেকে যেত। ব্লগার, লেখক, প্রকাশকদের একের পর এক কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছিল, আর প্রথম আলো-দ্য ডেইলি স্টার ব্যস্ত ছিল সরকারের সমালোচনায়।
এটা কি সাংবাদিকতা? না, এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত এজেন্ডার অংশ। মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনাম জানতেন তারা কী করছেন। তারা বুঝতেন যে তাদের নীরবতা জামায়াত-শিবিরকে আরও শক্তিশালী করছে, তাদের সাহস বাড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের কাছে সেটা ছিল গৌণ। মুখ্য ছিল শেখ হাসিনাকে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা থেকে সরানো। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের সাথে হাত মেলাতেও দ্বিধা করেননি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল সহিংসতা, তখন এই দুই পত্রিকার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা যখন পুলিশ হত্যা করছিল, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছিল, নারীদের ধর্ষণ করছিল, তখন এই পত্রিকাগুলো সেসব ঘটনাকে বর্ণনা করছিল ‘ছাত্র আন্দোলন’ হিসেবে। যেসব ছবি, যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ সহিংসতার আসল চেহারা তুলে ধরতে পারত, সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে রাখা হলো। যেসব ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল কীভাবে সংঘবদ্ধভাবে খুন আর ধর্ষণ চালানো হচ্ছে, সেগুলো কখনো এই পত্রিকার পাতায় জায়গা পেল না।
বরং তারা তৈরি করল একটা বিকল্প বয়ান। জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের সাজানো হলো ‘নিপীড়িত ছাত্র’ হিসেবে। যারা পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের বলা হলো ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী’। যে আন্দোলনের পেছনে ছিল বিদেশি অর্থায়ন, সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদ আর জামায়াতের সুপরিকল্পিত নীলনকশা, সেটাকে তুলে ধরা হলো ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে। এটা শুধু মিথ্যাচার নয়, এটা ইতিহাস বিকৃতি। এটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
প্রথম আলো আর দ্য ডেইলি স্টার যখন এই বিকৃত বয়ান গড়ছিল, তখন তারা জানত না যে তারা আসলে দেশের সামরিক অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করছে? অবশ্যই জানত। মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনাম অভিজ্ঞ সাংবাদিক, তারা বোঝেন কীভাবে একটা বয়ান জনমত তৈরি করে। তারা বুঝতেন যে তাদের লেখা প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শিরোনাম একটা নির্বাচিত সরকারকে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। তারা বুঝতেন যে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন সুদখোর মহাজনকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জনমত তৈরি করছেন।
আর সেটাই হলো। জুলাইয়ের রক্তাক্ত সহিংসতার পর যখন ইউনূস ক্ষমতায় এলেন, তখন তার পেছনে ছিল না কোনো নির্বাচন, না কোনো গণরায়। ছিল শুধু সামরিক বাহিনীর সমর্থন, জামায়াতের মদদ, আর প্রথম আলো-দ্য ডেইলি স্টারের তৈরি করা মিথ্যা বয়ান। এই অবৈধ সরকারের বৈধতা দিতে এই দুই পত্রিকা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না যে তারা এই ষড়যন্ত্রের সক্রিয় অংশীদার।
ইউনূসের তথাকথিত ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ যখন ক্ষমতায় এল, তখন শুরু হলো নির্মম প্রতিশোধের খেলা। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হলো, নির্যাতন করা হলো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের ওপর নেমে এল পরিকল্পিত আক্রমণ। হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলল নিপীড়ন। যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া শুরু হলো। জামায়াত-শিবিরের লোকজন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে শুরু করল। আর এসব দেখেও প্রথম আলো-দ্য ডেইলি স্টার রইল নীরব। তাদের সমালোচনার ভাষা, যেটা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে এত তীব্র ছিল, সেটা ইউনূসের অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে কোথায় গেল?
এই নীরবতা প্রমাণ করে যে তাদের কাছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাংবাদিকতার নীতি, এসব শুধুই ছিল হাতিয়ার। যতদিন পর্যন্ত এগুলো দিয়ে শেখ হাসিনাকে আক্রমণ করা যাচ্ছিল, ততদিন এগুলোর মূল্য ছিল। কিন্তু যখন ইউনূসের সরকার আরও বড় অপরাধ করছে, তখন এই নীতিগুলো হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল।
মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনাম হয়তো ভাবছেন তারা জিতে গেছেন। তারা হয়তো নিজেদের বলছেন যে তারা একটা ‘স্বৈরশাসন’ থেকে দেশকে মুক্ত করেছেন। কিন্তু ইতিহাস তাদের বিচার করবে ভিন্নভাবে। ইতিহাস মনে রাখবে যে এই দুই ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটা কুখ্যাত সংগঠনকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন। ইতিহাস মনে রাখবে যে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন সুদখোর মহাজনকে দেশের নেতা বানাতে সাহায্য করেছেন। ইতিহাস মনে রাখবে যে তারা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেছেন দেশদ্রোহিতার হাতিয়ার হিসেবে।
বাংলাদেশ আজ যে সংকটের মধ্যে আছে, তার জন্য মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনাম সরাসরি দায়ী। তারা নিজেদের কলম বিক্রি করেছেন, নিজেদের বিবেক বিক্রি করেছেন, আর শেষ পর্যন্ত নিজেদের দেশকে বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রথম আলো আর দ্য ডেইলি স্টার আজ আর সংবাদপত্র নয়, এগুলো হয়ে গেছে প্রোপাগান্ডা মেশিন। এদের সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হয় ব্যক্তিগত আক্রোশ আর রাজনৈতিক স্বার্থ দিয়ে, সত্য বা দেশের স্বার্থ দিয়ে নয়।
এই দুই পত্রিকার পতন তাদের নিজেদের কর্মেরই স্বাভাবিক পরিণতি। যখন তুমি সত্যের চেয়ে প্রতিহিংসাকে বেশি গুরুত্ব দাও, যখন তুমি দেশের চেয়ে নিজের ক্ষোভকে বড় করে দেখো, যখন তুমি মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের সাথে হাত মেলাও শুধু ব্যক্তিগত শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য, তখন তোমার পতন অনিবার্য। মতিউর রহমান আর মাহফুজ আনাম সেই পতনের প্রতীক হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে, সবচেয়ে কালো অধ্যায়ের নায়ক হিসেবে।

